পর্যায় সারণি

From Notun boi
Jump to: navigation, search

সূচিপত্র


রসায়নের ধারণা
পদার্থের অবস্থা
পদার্থের গঠন
পর্যায় সারণি
রাসায়নিক বন্ধন
মোলের ধারণা ও রাসায়নিক গণনা
রাসায়নিক বিক্রিয়া SSC
রসায়ন ও শক্তি
এসিড-ক্ষার সমতা
খনিজ সম্পদ ধাতু-অধাতু
খনিজ সম্পদ-জীবাশ্ম
আমাদের জীবনে রসায়ন


পর্যায় সারণি হলো ছকের মাধ্যমে প্রকাশিত রাসায়নিক মৌলসমূহের ধর্মের একটি ধারণাচিত্র। 2012 সাল পর্যন্ত সর্বমোট 118টি মৌল শনাক্ত হয়েছে। প্রত্যেক মৌলের এসব ধারণা আলাদা আলাদাভাবে আয়ত্ত করা অসম্ভব। পর্যায় সারণিতে স্বল্প পরিসরে মৌলসমূহকে তাদের ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করা হয়েছে। পর্যায় সারণি দেখেই আমরা কোনো একটি মৌলের রাসায়নিক আচরণ সম্পর্কে ধারণা করতে পারি। এ অধ্যায়ে পর্যায় সারণির সৃষ্টি থেকে শুরু করে বাস্তবে এর ব্যবহার ও উপকারিতার আলোচনা করা হয়েছে।

Rosayon. 4.1.jpg

এই অধ্যায় পাঠ শেষে আমরা-
(১) পর্যায় সারণি বিকাশের পটভূমি বর্ণনা করতে পারব।
(২) মৌলের সর্ববহিঃস্থ শক্তিস্তরের ইলেকট্রন বিন্যাসের সাথে পর্যায় সারণির প্রধান গ্রুপগুলোর সম্পর্ক নির্ণয় করতে পারব (প্রথম 30টি মৌল)।
(৩) একটি মৌলের পর্যায় শনাক্ত করতে পারব।
(৪) পর্যায় সারণিতে কোনো মৌলের অবস্থান জেনে এর ভৌত ও রাসায়নিক ধর্ম সম্পর্কে ধারণা করতে পারব।
(৫) মৌলসমূহের বিশেষ নামকরণের কারণ বলতে পারব।
(৬) পর্যায় সারণির গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে পারব।
(৭) পর্যায় সারণির একই শ্রেণির মৌল দ্বারা গঠিত যৌগের একই ধরনের ধর্ম হাতে-কলমে কাজের মাধ্যমে প্রদর্শন করতে পারব।
(৮) পরীক্ষণের সময় কাচের যন্ত্রপাতির সঠিক ব্যবহার করতে পারব।
(৯) পরীক্ষণ কাজে সতর্কতা অবলম্বন করব।
(১০) পর্যায় সারণি অনুসরণ করে মৌলসমূহের ধর্ম অনুমানে আগ্রহ প্রদর্শন করব।

৪.১ পর্যায় সারণির পটভূমি[edit]

পর্যায় সারণি হলো- শতবর্ষ ধরে সংগৃহীত বিভিন্ন রাসায়নিক ধারণার এক অবিস্মরণীয় প্রতিফলন। মানুষ প্রাচীনকাল থেকে বিক্ষিপ্তভাবে পদার্থ ও তাদের ধর্ম সম্পর্কে যে সকল ধারণা অর্জন করেছিল তার একটি সম্মিলিত রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টা বিজ্ঞানীদের ছিল আগে থেকেই। যা পরবর্তীতে মৌলসমূহের ধর্মভিত্তিক শ্রেণিতে ভাগ করতে সহায়তা করেছে তথা আধুনিক পর্যায় সারণি উপহার দিয়েছে। ল্যাভয়সিয়ে (Antoine Lavoisier) সর্বপ্রথম 1789 সালে ভৌত অবস্থার উপর ভিত্তি করে মৌলসমূহকে তিন শ্রেণিতে বিভক্ত করেন। পরবর্তীতে 1864 সালে ইংরেজ বিজ্ঞানী জন নিউল্যান্ড (John A. R. Newlands) মৌলকে তাদের ভর অনুযায়ী সাজিয়ে প্রতি অষ্টম মৌলসমূহের ভৌত ও রাসায়নিক ধর্মে মিল দেখতে পান। ১৮৬৯ সালে রুশ বিজ্ঞানী ম্যান্ডেলিফ (mitri I. Mendeleev) এবং জার্মান বিজ্ঞানী লুথার মেয়র (J. Lothar Meyer) পৃথক পৃথকভাবে একই ধর্মবিশিষ্ট বিভিন্ন মৌলকে সমশ্রেণিভুক্ত করার প্রয়াসে মৌলসমূহের একটি তালিকা প্রকাশ করেন। যা রসায়নে ‘পর্যায় সারণি’ (periodic table) নামে খ্যাত।
২০১২ সাল পর্যন্ত সর্বমোট ১১৮ টি মৌল শনাক্ত হয়েছে। তন্মধ্যে আন্তর্জাতিক রসায়ন ও ফলিত রসায়ন সংস্থা (International Union of Pure and Applied Chemistr), ১১৪টিকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এখানে জেনে রাখা ভালো যে, সংস্থাটিকে সংক্ষেপে IUPAC বলা হয়। সংস্থাটি আন্তর্জাতিকভাবে রসায়ন ও ফলিত রসায়নের বিভিন্ন বিষয়াদি যেমন- বিভিন্ন নিয়মকানুন, ক্রমবর্ধমান পরিবর্তনের বা সৃষ্টির কোনটি গ্রহণীয় আর কোনটি বর্জনীয় তার দেখভাল ইত্যাদির নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। যাহোক, সর্বশেষ স্বীকৃত ১১৪ টি মৌলের মধ্যে ১১২ টির নামকরণ করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৯৮ টি মৌল প্রকৃতিতে পাওয়া যায়। বাকি মৌলগুলো উন্নতমানের পরীক্ষাগারে তৈরি করা সম্ভব। ৯৮ টি মৌলের মধ্যে ৮৪ টি মৌলকে প্রাথমিক মৌল বলা হয় এবং বাকি ১৪ টি মৌল তেজস্ক্রিয়তার মাধ্যমে উৎপন্ন হয়। মজার ব্যাপার হলো, ল্যাভয়সিয়ে মাত্র ৩৩টি মৌলের একটি ছক তৈরি করেছিলেন। পরবর্তীতে রুশ বিজ্ঞানী ম্যান্ডেলিফ ৬৭ টি মৌল নিয়ে আধুনিক পর্যায় সারণি প্রবর্তন করেন যার মধ্যে ৬৩ টি মৌল অবি®কৃত হয়েছিল এবং বাকি ৪টি মৌল তখনও অবি®কৃত হয়নি কিন্তু পরবর্তীতে অবি®কৃত হয়েছে। তারপর ১৯০০ সালের মধ্যেই পর্যায় সারণিতে আরও ৩০টি মৌল যুক্ত হয়। তাহলে আমরা বুঝলাম যে পর্যায় সারণির মৌলসমূহের বেশির ভাগই অষ্টাদশ শতাব্দীতে আবিষ্কৃত হয়েছিল।

9,10 Rosayon. chok, 1.8.C.jpg

৪.২ পর্যায় সারণির বৈশিষ্ট্য[edit]

ভৌত দিক বিবেচনায় পর্যায় সারণি হলো- রাসায়নিক মৌলসমূহের ছকে সন্নিবেশ মাত্র। প্রকৃতপক্ষে, পর্যায় সারণি মৌলসমূহের ধর্মের ধারণাচিত্র। পর্যায় সারণি আবিষ্কারের পর থেকে বিভিন্ন সময়ে এর পরিবর্তন ও পরিমার্জন করা হয়েছে। সর্বশেষ পর্যায় সারণির যে সংস্করণটি IUPAC কর্তৃক গৃহীত হয়েছে তা চিত্র -৪.১ -এ দেখানো হলো।
এটাকে আধুনিক পর্যায় সারণি বলা হয়। আধুনিক পর্যায় সারণির উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যগুলো নিম্নরূপ:

  • পর্যায় সারণিতে ৭টি পর্যায় বা আনুভূমিক সারি (row) ও ১৮ টি গ্রুপ বা খাড়া স্তম্ভ (column) রয়েছে।
  • প্রতিটি পর্যায় বাম দিক থেকে গ্রুপ- ১ হিসেবে শুরু করে গ্রুপ - ১৮ পর্যন্ত বিস্তৃত।
  • মূল পর্যায় সারণির নিচে ২ টি আনুভূমিক সারি এবং ১৪টি খাড়া স্তম্ভবিশিষ্ট একটি ছোট ছক প্রদর্শিত হয়েছে।

এটিও মূল পর্যায় সারণির পর্যায়- ৬ ও পর্যায়- ৭ -এর অংশবিশেষ।

  • পর্যায় - ১ -এ শুধুমাত্র দুটি মৌল রয়েছে, যারা গ্রুপ - ১ ও গ্রুপ - ১৮ তে অবস্থিত। একইভাবে পর্যায় - ২ ও পর্যায়- ৩

এ আটটি করে মৌল আছে যারা গ্রুপ - ১ থেকে গ্রুপ- ৩ এবং গ্রুপ - ১৩ থেকে গ্রুপ - ১৮ -এর মধ্যে অবস্থিত।

  • পর্যায় -৪ থেকে পর্যায় -৭ পর্যন্ত সবগুলো পর্যায়ের প্রতিটি গ্রুপই মৌল দ্বারা পূর্ণ।

.C.jpg|500px|thumbnail|center|ছক ৪.১: পর্যায় সারণির বিভিন্ন মৌল]]

উপরিল্লিখিত বৈশিষ্ট্যগুলো পর্যায় সারণির বাহ্যিক দিক লক্ষ করলে দেখতে পাই। এবার মৌলসমূহের ধর্মের ভিত্তিতে পর্যায় সারণিকে বিবেচনা করি।

  • একই পর্যায়ে বামদিক থেকে ডানদিকে মৌলসমূহের ধর্ম পরিবর্তিত হয়।
  • সাধারণভাবে মৌলসমূহের ধর্ম তাদের গ্র“পের উপর নির্ভরশীল। একই গ্রুপের সকল মৌলের ভৌত ও রাসায়নিক

ধর্ম প্রায় একই রকম।

  • সাধারণভাবে কোনো মৌলের সর্বশেষ স্তরের ইলেকট্রন সংখ্যা তার গ্র“প সংখ্যার সমান।
  • কোনো মৌলের সর্বমোট কক্ষপথ সংখ্যা তার পর্যায় সংখ্যার সমান।

প্রথমদিকে আবিষ্কৃত মৌলসমূহকে বিজ্ঞানীরা ধাতু ও অধাতু এই দুই শ্রেণিতে বিভক্ত করেন। ধাতুসমূহকে আবার তুলনামূলকভাবে কম সক্রিয় ধাতু [সোনা, রুপা; যাদেরকে অভিজাত ধাতু (noble metal) বলে] এবং অধিক সক্রিয় ধাতু [লোহা, দস্তা; যাদেরকে নিকৃষ্ট ধাতু (inferior metals) বলে] হিসেবে বিভক্ত করা হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ডাল্টনের পারমাণবিক তত্ত্ব উপস্থাপনের পর রসায়ন চর্চায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। ১৮২৯ সালে জার্মান বিজ্ঞানী জে. ডব্লিউ. ডোবেরাইনার পারমাণবিক ভরের সাথে সম্পর্কিত করে ত্রয়ী সূত্র (law of Triads) প্রদান করেন।
ত্রয়ী সূত্র: পর্যায় সারণির দুটি মৌলের পারমাণবিক ভরের গড় অন্য একটি মৌলের একটি মৌলের পারমাণবিক ভরের প্রায় সমান এবং মৌল তিনটির ধর্ম একইরকম। এই তিনটি মৌলকে পারমাণবিক ভর অনুসারে সাজালে প্রথম এবং তৃতীয় মৌলের ভরের গড় দ্বিতীয় মৌলের ভরের সমান হয়। মৌল তিনটিকে ‘ডোবেরাইনার ত্রয়ী’ বলে। যেমন, লিথিয়াম (৭) ও পটাসিয়ামের (৩৯) পারমাণবিক ভরের গড় সোডিয়ামের (২৩) পারমাণবিক ভরের প্রায় সমান।
১৮৬৪ সালে ইংরেজ বিজ্ঞানী জন নিউল্যান্ড (John A. R. Newlands) মৌলকে তাদের ভর অনুযায়ী সাজিয়ে প্রতি অষ্টম মৌলসমূহের ভৌত ও রাসায়নিক ধর্মে মিল দেখতে পান। এর ভিত্তিতে তিনি অষ্টক তত্ত্ব প্রস্তাব করেন।
অষ্টক তত্ত্ব: মৌলগুলোকে তাদের পারমাণবিক ভর অনুযায়ী সাজালে প্রতি অষ্টম মৌলসমূহের ধমের্র মিল দেখা যায়। যা পর্যায় সারণির ‘অষ্টক ত্বত্ত’ (law of octaves) নামে পরিচিত।
রাশিয়ান রসায়নবিদ ডিমিট্রি ম্যান্ডেলিফ মৌলসমূহের রাসায়নিক ধর্ম নিয়ে গবেষণা করে ১৮৬৯ সালে আবিষ্কৃত মৌলসমূহের পারমাণবিক ভরের উচ্চক্রমানুসারে সাজিয়ে দেখেন একই ধর্মবিশিষ্ট মৌলসমূহ একই কলামে স্থান পায়। এর উপর ভিত্তি করে তিনি পর্যায় সূত্র প্রস্তাব করেন। পর্যায় সারণি উদ্ভাবনে বিভিন্ন বিজ্ঞানীর অবদান থাকলেও অবদানের গুরুত্ব বিবেচনা করে ম্যান্ডেলিফকে পর্যায় সারণির জনক বলে।
ম্যান্ডেলিফের পর্যায় সূত্র: “যদি মৌলসমূহকে ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক ভর অনুসারে সাজানো হয়, তবে তাদের ভৌত ও রাসায়নিক ধর্মাবলি পর্যায়ক্রমে আবর্তিত হয়”।
১৯১৩ সালে বিজ্ঞানী হেনরি মোসলে পারমাণবিক সংখ্যা আবিষ্কারের পর ম্যান্ডেলিফ তার পর্যায় সূত্র সংশোধন করেন। ম্যান্ডেলিফের সংশোধিত পর্যায় সূত্র: “মৌলসমূহের ভৌত ও রাসায়নিক ধর্মাবলি তাদের পারমাণবিক সংখ্যা অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে আবর্তিত হয়”।

৪.৪ পর্যায় সারণির মূল ভিত্তি[edit]

বিজ্ঞানী ম্যান্ডেলিফ প্রথম আধুনিক পর্যায় সারণিতে মৌলসমূহের পারমাণবিক ভরের ভিত্তিতে সাজানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু পারমাণবিক ভরের ভিত্তিতে মৌলসমূহের বিন্যাস করলে কিছু কিছু ব্যতিক্রম লক্ষ করা যায়। পটাসিয়াম (K) ও আর্গন (Ar) -এ র অবস্থান উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা কর। পটাসিয়ামের (K) পারমাণবিক ভর- ৩৯ ও আর্গনের (Ar) পারমাণবিক ভর হলো- ৪০। যদি পারমাণবিক ভর অনুসারে সাজানো হয়, তাহলে পটাসিয়ামকে আর্গনের আগে স্থান দিতে হয়। সেক্ষেত্রে পটাসিয়ামের অবস্থান হয় গ্রুপ- ১৮ তে এবং গ্রুপ - ১ -এ স্থান পায় আর্গন । বাস্তবে ভৌত ও রাসায়নিক ধর্মাবলির বিচারে পটাসিয়ামের সাথে গ্রুপ - ১ -এ অবি স্থত ক্ষার ধাতুগুলোর এবং আর্গনের সাথে গ্রুপ - ১৮- তে অবস্থিত নিষ্ক্রিয় গ্যাসের সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু মৌলসমূহকে পারমাণবিক সংখ্যার ভিত্তিতে সাজালে এধরনের জটিলতার অবসান হয়।
আমরা তৃতীয় অধ্যায়ে ইলেকট্রন ও প্রোটন সম্পর্কে জেনেছি। প্রোটন সংখ্যাকেই পারমাণবিক সংখ্যা বলে। আর কোনো মৌলে যতটি ইলেকট্রন থাকে ঠিক ততটি প্রোটন থাকে। তাহলে কোনো মৌলের ইলেকট্রন সংখ্যাকেও তার পারমাণবিক সংখ্যা বলা যায়। যদিও ইলেকট্রন সংখ্যা পরিবর্তনের সাথে পরমাণুর পরিবর্তন হয় না কিন্তু প্রোটন সংখ্যা পরিবর্তনে পরমাণুর পরিবর্তন হয়। পর্যায় সারণিতে ইলেকট্রন বিন্যাসের উপর ভিত্তি করেই মৌলসমূহের ভৌত ও রাসায়নিক ধর্মাবলি তাদের পারমাণবিক সংখ্যা অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে আবর্তিত হয়। কোনো মৌলের ইলেকট্রন বিন্যাসই মূলত তার রাসায়নিক ধর্মাবলি নির্দেশ করে।
১৮৬৯ সালে ম্যান্ডেলিফ আধুনিক পর্যায় সারণির প্রবর্তন করেন, যখন পারমাণবিক সংখ্যা সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। ১৯১৩ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী হেনরি মোসলে পারমাণবিক সংখ্যার ধারণা দেন। পরবর্তীতে ম্যান্ডেলিফ আধুনিক পর্যায় সারণিতে পারমাণবিক সংখ্যার ধারণা ব্যবহার করে পর্যায় সূত্রের সংশোধিত রূপ প্রকাশ করেন। বিজ্ঞানী ম্যান্ডেলিফকে আধুনিক পর্যায় সারণি প্রবর্তণের সম্মান দেওয়া হয়। কারণ অনুমান করা হয় যে, পারমাণবিক সংখ্যা সম্পর্কে জানা থাকলে বিজ্ঞানী ম্যান্ডেলিফ তাঁর প্রদত্ত পর্যায় সূত্রে পারমাণবিক ভরের পরিবর্তে পারমানবিক সংখ্যার কথাই হয়তোবা বলতেন।

৪.৫ ইলেকট্রন বিন্যাস থেকে পর্যায় সারণিতে মৌলের অবস্থান নির্ণয়[edit]

উপরে আমরা জেনেছি যে, ইলেকট্রন বিন্যাসই হলো- পর্যায় সারণির মূলভিত্তি। তাহলে পর্যায় সারণিতে কোনো মৌলের অবস্থান তার ইলেকট্রন বিন্যাস থেকে বুঝা যায়। নিচের ছকে (ছক - ৪.২) কয়েকটি মৌলের ইলেকট্রন বিন্যাস লিপিবদ্ধ করা হলো। মৌলসমূহের বিভিন্ন স্তরে ইলেকট্রন বিন্যাস দেখানো হলো। কোনো মৌলের যতটি শক্তিস্তরে ইলেকট্রন বিন্যস্ত থাকে, শক্তিস্তরের সে সংখ্যাই হলো ঐ মৌলের পর্যায় সংখ্যা। যেমনÑ হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের কথা বিবেচনা করা যাক। এদের ক্ষেত্রে একটি মাত্র শক্তিস্তরের ইলেকট্রন বিন্যস্ত থাকে এবং পর্যায় সারণিতে এদের অবস্থান পর্যায়- ১ -এ । অনুরূপভাবে সোডিয়াম থেকে আর্গন পর্যন্ত মৌলসমূহের ইলেকট্রন তিনটি শক্তিস্তরে বিন্যস্ত। তাহলে সহজেই বলা যায় যে, তাদের পর্যায় সংখ্যা হলো ৩।<br> কিছু ব্যতিক্রম ব্যতীত, সাধারণভাবে সর্ববহিঃস্থ শক্তিস্তরে অবস্থিত ইলেকট্রন সংখ্যাই কোনো নির্দিষ্ট পর্যায়ে উক্ত মৌলের গ্রুপ সংখ্যা বলা যায়। তাহলে আমরা ভেবে দেখলে বুঝব যে, ৭টি পর্যায়েরই গ্রুপ - ১ এর ক্ষেত্রে উলি-খিত নিয়মটি প্রয্যোজ্য নয়।

৪.৬ মৌলের পর্যায়বৃত্ত ধর্ম[edit]

পর্যায় সারণিতে যে কোনো একটি পর্যায়ের দিকে লক্ষ করলে দেখি যে, বাম দিকের মৌলগুলো সাধারণত ধাতু ক্রমে তা অপধাতু এবং অধাতুতে আবর্তিত হয়। ৩য় পর্যায়ের সর্ব বামে সোডিয়াম রয়েছে, যা একটি সক্রিয় ধাতু। অন্যদিকে ক্লোরিন (ডানদিকে দ্বিতীয়) একটি সক্রিয় অধাতু। এ দ্ইুয়ের মাঝ ামাঝিমৌলগুলোর মধ্যে ধাতু থেকে অধাতুতে রূপান্তরের একটি ধারাবাহিকতা পরিলক্ষিত হয়। সোডিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও অ্যালুমিনিয়াম ধাতব প্রকৃতির। সিলিকন একটি অপধাতু (যা ধাতু ও অধাতু উভয়ের বৈশিষ্ট্য বহন করে)। ফসফরাস, সালফার ও ক্লোরিন এরা সবাই অধাতু ও এদের গলনাংক ও স্ফুটনাংক কম। যে কোনো গ্রুপে মৌলসমূহের ভৌত ও রাসায়নিক ধর্ম ধীরে ধীরে এবং অনেকটা নিয়মিতভাবে আবর্তিত হয়। যেমন- গ্রুপ-১ -এর ক্ষার ধাতুসমূহ প্রত্যেকেই নরম, নিম্ন গলনাংকবিশিষ্ট। এ গ্রুপের ধাতুসমূহের গলনাংক পারমাণবিক সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে কমে। পর্যায় সারণির বাম দিক থেকে ডান দিকে অর্থাৎ গ্রুপ-১ থেকে গ্রুপ-১৭ পর্যন্ত মৌলসমূহের গলনাংক ও স্ফুটনাংক প্রথমে বৃদ্ধি পেয়ে (ধাতু পর্যন্ত) পরবর্তীতে (অধাতু থেকে) হ্রাস পায়। এভাবে গ্রুপ-১৭ অর্থাৎ হ্যালোজেনসমূহের গলনাংক ও স্ফুটনাংক গ্রুপ-১ -এর ক্ষার ধাতুসমূহের তুলনায় অনেক কম হয়। হ্যালোজেনসমূহের ক্ষেত্রেবিভিন্ন ভৌত ধর্মে একই রূপে ধারাবাহিক পরিবর্তন দেখা যায়।
যেমন-এসব মৌলের গলনাংক, স্ফুটনাংক ও ঘনত্ব পারমাণবিক সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়ে। এছাড়াও মৌলসমূহের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য যেমন, পারমাণবিক আকার, আয়নিকরণ শক্তি, তড়িৎ ঋণাত্মকতা, ইলেকট্রন আসক্তি ইত্যাদি ধর্ম পর্যায় সারণিতে পর্যায়ক্রমে পরিবর্তিত হয়। পর্যায় সারণির একই পর্যায়ের বামদিক থেকে ডানদিকে পারমাণবিক আকার হ্রাস পায় এবং কোনো গ্র“পের উপর থেকে নিচের দিকে পারমাণবিক আকার বৃি দ্ধ পায়। পারমাণবিক আকার ব্যতীত অন্যান্য ধর্মসমূহ সাধারণভাবে (কিছু ব্যতিক্রমসহ) পর্যায় সারণির একই পর্যায় বাম দিক থেকে ডান দিকে পারমাণবিক সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ গ্রুপ-১ -এর ক্ষার ধাতুসমূহের আয়নিকরণ শক্তি কম এবং গ্রুপ- ১৭ -এর হ্যালোজেনসমূহের আয়নিকরণ শক্তি বেশি। একইভাবে কোনো একটি গ্রুপের মৌলসমূহের পারমাণবিক সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে উক্ত ধর্মসমূহ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পায়। এ বিষয়ে পরবর্তী শ্রেণিতে আরও জানতে পারবে।

চিত্র ৪.২: বিভিন্ন মৌল

৪.৭ বিভিন্ন শ্রেণিতে উপস্থিত মৌলসমূহের বিশেষ নাম (ক্ষার ধাতু, মৃৎক্ষার ধাতু, মুদ্রা ধাতু,হ্যালোজেন, নিষ্ক্রিয় গ্যাস, অবস্থান্তর মৌল)[edit]

ক্ষার ধাতু:পর্যায় সারণিতে গ্রুপ- ১ -এ অবস্থিত মৌলসমূহ যেমন- Li,Na,K,Rb,Csএবং Fr ক্ষার ধাতু (alkali metal) বলা হয়। এরা প্রত্যেকেই পানির সাথে বিক্রিয়া করে হাইড্রোজেন গ্যাস ও ক্ষার দ্রবণ তৈরি করে। সর্ববহিঃস্থ শক্তিস্তরে অবস্থিত একমাত্র ইলেকট্রনটি প্রদান করে আয়নিক যৌগ (লবণ) তৈরি করে।
মৃৎক্ষার ধাতু : গ্রুপ- ২ -এ অবস্থিত Be থেকে শুরু করে Ra পর্যন্ত মৌলসমূহকে মৃৎক্ষার ধাতু বলা (alkaline earth meta) হয়। এদের ধর্ম অনেকটা ক্ষার ধাতুর মতোই। এদের অক্সাইড সমূহ পানিতে ক্ষারীয় দ্রবণ তৈরি করে। এরাও সর্ববহিঃস্থ শক্তিস্তরের ২ টি ইলেকট্রন প্রদান করে আয়নিক যৌগ (লবণ) তৈরি করে। এই মৌলসমূহ বিভিন্ন যৌগ হিসেবে মাটিতে থাকে।
অবস্থান্তর মৌল:পর্যায় সারণিতে গ্রুপ- ৩ থেকে গ্রুপ-১১ পর্যন্ত গ্রুপে অবস্থিত মৌলসমূহ অবস্থান্তর মৌল (transition meta) হিসেবে পরিচিত। অবস্থান্তর মৌলসমূহের নিজস্ব বর্ণ রয়েছে। এরা ধাতব পদার্থ হিসেবে প্রচুর ব্যবহৃত হয়। সর্ববহিঃস্থ শক্তিস্তরের ইলেকট্রন প্রদান করে আয়নিক যৌগ তৈরি করে। কোনো পর্যায়ের অবস্থা ন্তর মৌলসমূহের মধ্যে বামদিকের মৌল থেকে ডানদিকের মৌল দ্বারা গঠিত যৌগের বৈশিষ্ট্য আয়নিক থেকে সমযোজীতে পরিবর্তিত হয়।
মুদ্রা ধাতু :পর্যায় সারণিতে গ্রুপÑ ১১ তে অবস্থিত মৌলÑ তামা (Cu), রুপা (Ag) ও সোনা (Au) এদের ধাতব বৈশিষ্ট্য যেমন উজ্জলতা বিদ্যমান। ঐতিহাসিকভাবে এসব ধাতু দ্বারা মুদ্রা তৈরি করে তাদেরকে ক্রয়-বিক্রয় ও অন্যান্য প্রয়োজনে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এদেরকে মুদ্রা ধাতু (coinage metals) বলা হয়। প্রকৃতপক্ষে এরা অবস্থান্তর মৌল।
হ্যালোজেন:গ্র“প- ১৭ তে অবস্থিত মৌলÑ F, Cl, Br, I এবং At এই ৫টি মৌলকে একত্রে হ্যালোজেন (halogen) বলে। হ্যালোজেন শব্দের অর্থ লবণ গঠনকারী (salt maker)। এরা সর্ববহিঃস্থ শক্তিস্তরে একটি ইলেকট্রন গ্রহণের মাধ্যমে হ্যালাইড আয়ন তৈরি করে। হ্যালোজেনসমূহের মূল উৎস সামুদ্রিক লবণ। এরা নিজে নিজেই ইলেকট্রন ভাগাভাগির (electron sharing) মাধ্যমে দ্বি-মৌল অণু তৈরি করে।
নিষ্ক্রিয় গ্যাস:পর্যায় সারণিতে গ্রুপ- ১৮ তে অবস্থিত মৌলসমূহকে নিষ্ক্রিয় মৌল বলে। এদের সর্ববহিঃস্থ শক্তিস্তর প্রয়োজনীয় সংখ্যক ইলেকট্রন দ্বারা পূর্ণ থাকায় এরা ইলেকট্রন আদান-প্রদান বা শেয়ারের মাধ্যমে যৌগ গঠনে সাধারণত আগ্রহ প্রদর্শন করে না। অর্থাৎ বন্ধন গঠনে বা রাসায়নিক বিক্রিয়ার প্রতি এই মৌলসমূহ নিষ্ক্রিয় থাকে।

৪.৮ পর্যায় সারণির সুবিধা (Advantages of Periodic Table)[edit]

রসায়নশাস্ত্রঅধ্যয়ন ও প্রয়োগকারীদের জন্য পর্যায় সারণি একটি অপরিহার্য হাতিয়ার (tool)। আধুনিক পর্যায় সারণি ব্যতীত রসায়ন চর্চা সম্ভব নয়। উপরে জেনেছি যে, এ যাবৎ ১১৮টি মৌল শনাক্ত হয়েছে। চল প্রত্যেকটি মৌলের যদি ৪টি ভৌত ধর্ম যেমন- গলনাংক, স্ফুটনাংক, ঘনত্ব ও ভৌত অবস্থা (কঠিন, তরল ও বায়বীয়) এবং ৪টি রাসায়নিক ধর্ম যেমনÑ অক্সিজেন, পানি, এসিড ও ক্ষারের সাথে বিক্রিয়া বিবেচনা কর। তাহলে ১১৮টি মৌলের জন্য ৪টি করে ভৌত ও ৪টি করে রাসায়নিক ধর্ম মিলে সর্বমোট ৪৭২টি ধর্ম মনে রাখা কঠিন নয় কি? আমরা এটাও জানি যে, কোনো

Rosayon.9,10 chok, 4.5.C.jpg
Rosayon.9,10 chok, 4.6.C.jpg

একটি কাচটিউবে আনুমানিক ২/৩ গ্রাম Na2CO3 নাও। অতঃপর বিশুদ্ধ পানিতে সেটি দ্রবীভূত কর এবং দ্রবণের মধ্যে ধীরে ধীরে লঘু হাইড্রোক্লোরিক এসিড যোগ কর। পর্যবেক্ষণ কর কোনো গ্যাস উৎপন্ন হয় কিনা। উৎপন্ন গ্যাসকে জ্বলন্ত কাঠির সাহায্যে শনাক্ত কর। রাসায়নিক পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করার জন্য উৎপন্ন গ্যাসকে বাঁকানো কাচনলের সাহায্যে বিকারে রাখা পরিষ্কার চুনের পানিতে প্রবেশ করাও এবং পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ কর। এই পরিবর্তনের কারণ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা কর। চুনের পানিতে অতিরিক্ত গ্যাস প্রবেশ করালে কী পরিবর্তন হয় তা পর্যবেক্ষণ কর এবং কারণ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা কর।
একইভাবে কাচটিউবে আনুমানিক ২/৩ গ্রাম নিয়ে পরীক্ষা কর। পরীক্ষা করে নিচের টেবিল পূর্ণ কর।

Rosayon.9,10 chok, 4.7.C.jpg

Share your opinion