রসায়নের ধারণা

From Notun boi
Jump to: navigation, search

সূচিপত্র


রসায়নের ধারণা
পদার্থের অবস্থা
পদার্থের গঠন
পর্যায় সারণি
রাসায়নিক বন্ধন
মোলের ধারণা ও রাসায়নিক গণনা
রাসায়নিক বিক্রিয়া SSC
রসায়ন ও শক্তি
এসিড-ক্ষার সমতা
খনিজ সম্পদ ধাতু-অধাতু
খনিজ সম্পদ-জীবাশ্ম
আমাদের জীবনে রসায়ন


বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার মধ্যে রসায়ন অন্যতম। রসায়নকে জীবনের জন্য বিজ্ঞান বলা হয়। প্রাচীনকাল থেকে রসায়ন চর্চার মাত্রা বেড়েই চলেছে। প্রাচীন আলকেমিদের রসায়ন চর্চা বর্তমানের রসায়ন শিল্পকে জন্ম দিয়েছে। কারণ রসায়নের বিস্তৃতি ব্যাপক। মানবজাতি ও পরিবেশের কল্যাণে রসায়ন সর্বদা নিয়োজিত। তাহলে তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে, রসায়ন কোথায় কোন কাজটির সাথে সম্পৃক্ত তা সবার জানা দরকার, যাতে আমরা দৈনন্দিন জীবনে রসায়নের জ্ঞান ব্যবহার করে উপকৃত হতে পারি। এ অধ্যায়ে রসায়নের পরিচিতি, বিভিন্ন ক্ষেত্রে রসায়নের বিস্তৃতি, রসায়নে অনুসন্ধান ও গবেষণা পদ্ধতির সাধারণ ধারণা ও রাসায়নিক দ্রব্যের সংরক্ষণ ও ব্যবহারের ঝুঁকি ইত্যাদির একটি সহজ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

কুইজː রসায়নের ইতিহাস

Rosayon. 1.jpg

বাঁ দিক থেকে - প্রাচীনকালের (আলকেমি) রসায়নাগার, আধুনিক রসায়নাগার এবং রাসায়নিক শিল্প-কারখানা। এই অধ্যায় পাঠ শেষে আমরা-

  • (১) রসায়নের ধারণা ব্যাখ্যা করতে পারব।
  • (২) রসায়নের ক্ষেত্রসমূহ চিহ্নিত করতে পারব।
  • (৩) রসায়নের সাথে বিজ্ঞানের অন্য শাখাগুলোর সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে পারব।
  • (৪) রসায়ন পাঠের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে পারব।
  • (৫) রসায়নে অনুসন্ধান ও গবেষণা প্রক্রিয়ার বর্ণনা করতে পারব।
  • (৬) বিভিন্ন ধরনের অনুসন্ধানমূলক কাজের পরিকল্পনা প্রণয়ন, অনুমিত সিদ্ধান্ত গঠন ও পরীক্ষা করতে পারব।
  • (৭) রসায়নে ব্যবহারিক কাজের সময় প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করতে পারব।
  • (৮) প্রকৃতি ও বাস্তব জীবনের ঘটনাবলি রসায়নের দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা করতে আগ্রহ প্রদর্শন করব।

১.১ রসায়ন পরিচিতি[edit]

রসায়ন প্রাচীন ও প্রধান বিজ্ঞানগুলোর অন্যতম। রসায়নে নানা ধরনের পরিবর্তন যেমনÑ সৃষ্টি, ধ্বংস, বৃদ্ধি, রূপান্তর, উৎপাদন ইত্যাদির আলোচনা করা হয়। রসায়নের চর্চা কয়েক সহস্রাব্দী থেকে হয়ে আসছে। ভারতবর্ষে প্রায় 5000 বছর পূর্বেই কাপড়কে আর্কষণীয় করে তুলতে রংয়ের ব্যবহার শুরু হয়েছিল। মানুষ ধাতব অস্ত্র, স্তম্ভ ও মূর্তি তৈরি করেছিল বহুকাল আগেই। পুরাতন সভ্যতায় রসায়ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে খনিজ থেকে মূল্যবান ধাতু যেমনÑ স্বর্ণ, রৌপ্য, সিসা প্রভৃতি আহরণ করা হতো। খ্রি. পূর্ব 2600 বছর পূর্বে মিশরীয়রা স্বর্ণ আহরণ করে, যা অভিজাত ও মূল্যবান ধাতু হিসেবে আজও সমাদৃত। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় রসায়ন চর্চা ‘আল- কেমি’ (Alchemy) নামে পরিচিত। আল - কেমি শব্দটি আরবি ‘আল -কিমিয়া ’ থেকে উ™ভূত, যা দিয়ে মিশরীয় সভ্যতাকে বুঝানো হতো। প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা রসায়ন চর্চার মাধ্যমে মানুষের চাহিদা বহুলাংশে মেটাতে সক্ষম হয়েছিল। আজ শিল্প -কারখানায় তেল, চিনি, কাগজ, কলম, ঔষধপত্র, কাপড়, স্যাম্পু, সাবান, রড-সি মেন্ট থেকে শুরু করে ব্যবহার্য অনেক সামগ্রী তৈরি রসায়নের মাধ্যমে হয়ে থাকে।
মজার ব্যাপার হলো, বর্তমান যুগে রসায়নের পরিচিতি শুধুমাত্র শিল্প -কারখানা, পরীক্ষাগার বা গবেষণাগারের কার্যক্রমেই সীমাবদ্ধ নয়। যদি আমরা চারপাশের ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি লক্ষ করি, তাহলে দেখতে পাব যে, সর্বক্ষেত্রেই রসায়নের উপস্থিতি রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে ছক-১.১ -এ কিছু ঘটনার উল্লেখ করা হলো ।
ছক-১.১ : রসায়নের উপস্থিতি

বিষয় বিশ্লেষণ
আম পেকে হলুদ বর্ণ
ধারণ
রং রাসায়নিক পদার্থ। আমের বর্ণ হলুদে রূপান্তর- আমের মধ্যে জীবরাসায়নিক
প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হলুদ বর্ণধারী নতুন যৌগের সৃষ্টিকেই বুঝায়।
লোহায় মরিচা ধরা

লোহা শক্ত, কিন্তু মরিচা ভঙুর। বিশুদ্ধ লোহা জলীয়বাষ্পের উপস্থিতিতে বায়ুর
অক্সিজেনের সাথে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে লোহার অক্সাইড নামক পদার্থে পরিণত হয়, যা
সাধারণভাবে মরিচা নামে পরিচিত।

কাঠ, কেরোসিন,
প্রাকৃতিক গ্যাস বা মোমে
আগুন জ্বালানো
উল্লেখিত বস্তুগুলো মূলত কার্বনের যৌগ দিয়ে গঠিত, যেমন- কাঠ হলো প্রধানত সেলুলোজ,
প্রাকৃতিক গ্যাস হলো মিথেন এবং মোম হলো কার্বন ও হাইড্রোজেনের যৌগ। এগুলোতে
আগুন জ্বালানোর অর্থ প্রকৃতপক্ষেই কার্বন যৌগের দহন, যা এক ধরনের রাসায়নিক বিক্রিয়া,
-এর ফলে কার্বন -ডাই-অ ক্সাইড গ্যাস, জলীয়বাষ্প ও তাপের উৎপাদন।

এবার তোমরা শিক্ষকের সহায়তায় তিনজন করে দল গঠন কর। প্রত্যেক দল পৃথকভাবে কয়েকটি বিষয় নিয়ে ভাবো যেখানে রসায়ন উপস্থিত থাকতে পারে। তারপর প্রত্যেক দল নিজস্ব ভাবনা থেকে যে কোনো তিনটি বিষয়ে রাসায়ন উপস্থিতি ব্যাখ্যাসহ ছক-১.২-এ উল্লেখ কর।

ছক-১.২ : দলগতভাবে তিনটি ঘটনায় রসায়নের উপস্থিতি ব্যাখ্যাসহ বর্ণনা কর।

___বিষয়___ ___বিশ্লেষণ___
- -
- -
- -

তাহলে এটা সহজেই অনুমান করা যায় যে, আমাদের পরিবেশে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন পরিবর্তনের সাথে রসায়ন কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ত। রান্নার মাধ্যমে খাবারের স্বাদের ভিন্নতা সৃষ্টিকে এক ধরনের রসায়ন বলা যেতে পারে। মোটকথা, প্রাচীন সভ্যতা থেকে আধুনিক যুগে রসায়নের সুবিশাল পরিভ্রমণ সমাজের তথা বিজ্ঞানের প্রায় সর্বক্ষেত্রেই লক্ষণীয়।

১.২ রসায়নের পরিধি[edit]

রসায়নের বিস্তৃতি ব্যাপক, যা মানুষের সেবায় নিয়োজিত। রসায়নের চর্চা সময়ের সাথে ক্রমবর্ধমান। চল এবার আমাদের জীবনে রসায়নের ব্যবহার বিবেচনা করি। তুমি জোরে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠলে এবং ব্রাশ করে পানি দিয়ে হাতমুখ ধুয়ে নিলে। একটু তেলজাতীয় জিনিস হাতমুখে মেখে, এবার চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়িয়ে টেবিলে পড়তে বসলে। লাল মলাটের বইটি খুলে দেখলে সাদা কাগজে কালো কালির অক্ষরের লেখাÑ এর সব কিছুতেই রসায়ন রয়েছে। কিছুক্ষণ পড়ার পর পেন্সিল বা কলম দিয়ে খাতায় প্রশ্নের উত্তর লিখলে। তারপর খাবার খেয়ে সাদা-শার্ট ও নীল-প্যান্ট পরে স্কুলে গেলে। রাস্তায় চোখে পড়ল একজন লোক বাগানে বা ক্ষেতে সার ব্যবহার করছেন। খেয়াল করলে যে, ধোঁয়া উড়িয়ে একটা মোটরসাইকেল তোমার পাশ দিয়ে চলে গেল। এসবের মধ্যেও রয়েছে রসায়ন।
এবার ছক-১.৩ -এ ব্যবহার্য জিনিসগুলোর মধ্যে রসায়নের উপস্থিতি বিবেচনা কর।

ছক ১.৩ : রসায়নের পরিধি বিবেচনার উদাহরণ

বস্তু উপাদান উৎস
নিঃশ্বাসে গৃহীত বায়ু প্রধানত অক্সিজেন প্রকৃতি, বায়ু
ব্রাশ, চিরুনি, কৃত্রিম রং,
কাগজ, খাতা, কালি,
পেন্সিল, কলম
বিভিন্ন রাসায়নিক যৌগের সমন্বয়ে
গঠিত
শিল্প -কারখানায় বিভিন্ন পদার্থের রাসায়নিক
পরিবর্তনের মাধ্যমে তৈরি করা হয়।
খাবারের পানি বিশুদ্ধ পানি হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন
পরমাণু দ্বারা গঠিত। খাবারের
পানিতে অন্যান্য খনিজও থাকে
পানি প্রকৃতিতে থাকে, যেমনÑ নদী, নালা, খাল,
বিল, সাগর, বৃষ্টি, ঝরনা ইত্যাদি।
খাবার শ্বেতসার, আমিষ, চর্বি সবই জৈব
যৌগ এবং বিভিন্ন খনিজ পদার্থ
উদ্ভিদ (সালোকসংশ্লেষণ) ও প্রাণী বিভিন্ন
প্রক্রিয়ার মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন ও সঞ্চয় করে।
খাবার খেলে আমাদের শরীরে বিপাক প্রক্রিয়া
ঘটে এবং আমরা শক্তি পাই।
শার্ট ও প্যান্ট জৈব যৌগ ও তন্তু -এর সম ন্বয়ে
গঠিত
রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন যৌগ থেকে
তৈরি কৃত্রিম তন্তু বা প্রাকৃতিক তন্তু -এর সাথে
রঞ্জকের সমন্বয়ে টেক্সটাইল - ফেব্রিকস শিল্পে
পোশাক তৈরি করা হয়।
সার অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, কার্বন,
ফসফরাস ইত্যাদি এবং বিভিন্ন
রাসায়নিক যৌগের সমন্বয়ে তৈরি
শিল্প -কারখানায় রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে
তৈরি করা হয়। রাসায়নিক সার মাটিতে উদ্ভিদের
পুষ্টি প্রদান করে।
মোটরসাইকেল ও এর
চলার শক্তি
বিভিন্ন ধাতু, প্লাস্টিক ইত্যাদি দিয়ে
তৈরি নানা যন্ত্রাংশের সমন্বয়ে নির্মিত
পেট্রোলিয়াম (জ্বালানি) দহনের
মাধ্যমে মোটরসাইকেল চলার শক্তি অর্জন করে।
রসায়নিক পদ্ধতি ব্যবহার করে আকরিক থেকে
ধাতব পদার্থ আহরিত হয়। প -াস্টিক শিল্প -
কারখানায় রসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি করা
হয়। পেট্রোলিয়ামের দহন হলো- রাসায়নিক বিক্রিয়া।

চিত্র-১.১ : প্রদত্ত ছবিগুলো দেখ এবং ঘটনাগুলো ভালোভাবে খেয়াল কর। উপস্থিত বিষয়গুলো থেকে ব্যবহৃত বিভিন্ন বস্তুর সাথে রসায়নের সংশি -ষ্টতার আলোকে নিচের ছকে (ছক- ১.৪) পূরণ কর এবং রসায় নের পরিধি নিয়ে অসম্পূর্ণ বাক্যটি পূর্ণ কর।

Rosayon. 1.1.jpg

ছক-১.৪ : তোমরা নিজেরা পূরণ কর।

---বস্তু--- ---উপাদান--- ---উৎস---
- - -
- - -
- - -
- - -

রসায়ন মানুষের চাহিদা যেমন- .........., ..........., ............., .................., ...................
যোগানে রসায়ন সার্বক্ষ ণিকভাবে নিয়োজিত।

১.৩ রসায়নের সাথে বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার সম্পর্ক[edit]

আমরা জেনেছি যে, রসায়ন হলো প্রধান বিজ্ঞানগুলোর অন্যতম। রসায়নের সাথে বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখা যেমনÑ গণিত, পদার্থ বিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, পরিবেশ বিজ্ঞান, ভূতত্ত্ব বিজ্ঞান ইত্যাদির বিশেষ যোগসূত্র রয়েছে। মোটকথা, অন্যান্য বিজ্ঞানসমূহ যেমনভাবে রসায়নের উপর নির্ভরশীল, তেমনভাবে রসায়নের অনেক বিষয়ের ব্যাখ্যা প্রদান বা তত্ত্বীয় ধারণা অন্য বিজ্ঞানের সাহায্য নিয়েই করতে হয়।
তোমরা জীবচক্রে পড়েছ যে, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সমগ্র প্রাণিকুলের খাদ্যের যোগানদাতা উদ্ভিদ। উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষণ (photosynthesis) নামক জীব -রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন উপায়ে আমাদের খাদ্য সঞ্চয় হয়।
আবার জীবের দেহ বিভিন্ন জটিল অণু যেমন- প্রোটিন, চর্বি, ক্যালসিয়ামের যৌগ, ডিএনএ (DNA) প্রভৃতি দ্বারা গঠিত। জীবের জন্ম ও বৃদ্ধি জীব-রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সাধিত হয়, যা জীববিজ্ঞানের বিষয়।
আধুনিককালে বিজ্ঞানের অবদান বলে খ্যাত বিদ্যুৎ, চুম্বক, কম্পিউটার ও বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স-এর তত্ত্ব, উৎপাদন ও ব্যবহারের আলোচনা পদার্থ বিজ্ঞানে করা হয়। আমরা যদি লক্ষ করি, তাহলে দেখতে পাই যে, পদার্থের বিভিন্ন রাসায়নিক গুণাবলির সমন্বয় ঘটিয়েই এসব বস্তুর সৃষ্টি। এখানে উদাহরণস্বরূপ বিদুতের উৎপাদন ও বিতরণকে বিবেচনা করা যেতে পারে। তেল, গ্যাস, কয়লা পুড়িয়ে অর্থাৎ রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে উৎপাদিত তাপ থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা হয় এবং তা ধাতব তারের (যেমন- তামা) ইলেকট্রন প্রবাহের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। কম্পিউটার ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক্স -এর বিভিন্ন ক্ষুদ্রাংশগুলো যেমন- সিডি, মেমোরি ডিস্ক, মনিটর প্রত্যেকটির গুণাবলি বিভিন্ন পদার্থের রাসায়নিক ধর্মের সমন্বয় ঘটিয়ে উক্ত বস্তুগুলো তৈরি করা হয়। অপরদিকে বলা হয়ে থাকে যে, প্রকৃতিতে যতটুকু অব্যবহৃত কপার (তামা) মজুদ আছে, তার চেয়ে বেশি পরিমাণ তামা ইতিমধ্যেই কম্পিউটার ও বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স তৈরি করতে ব্যবহার করা হয়েছে। এভাবে তামার ব্যবহার হলে তা এক সময় ফুরিয়ে যাবে। তাছাড়াও নষ্ট হয়ে এসব যন্ত্রাংশ দিনে দিনে বাড়তে থাকবে এবং আমাদের পরিবেশকে ক্ষতি করবে। তাহলে কম্পিউটার ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক্স নষ্ট হয়ে গেলে, ঐ সব যন্ত্রাংশ থেকে তামার পুনরুদ্ধার করে তার পুনর্ব্যবহার করা জরুরি। সেটিও রসায়ন চর্চার মাধ্যমেই সম্ভব।
অন্যদিকে, উদ্ভিদ ও প্রাণীর মৃত্যুর পর দেহের পচন হয় এবং নানা অণুজীব প্র্রক্রিয়ার ফলে মাটির সাথে মিশে যায়। ভূগর্ভের বিশোষিত তাপ ও চাপের প্রভাবে মাটিতে মিশে যাওয়া পদার্থের আরও রাসায়নিক পরিবর্তন হয়। ফলে বিভিন্ন খনিজ পদার্থ যেমনÑ পেট্রোলিয়াম, কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাস ইত্যাদিতে পরিণত হয়। বায়ুমণ্ডলীয় বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ওজোনস্তর ও ওজোনস্তর ক্ষয়কারী গ্যাসসমূহের চিহ্নিতকরণ রসায়নের বিভিন্ন পদ্ধতির সাহায্যেই করা হয়।
এবার অন্যান্য বিজ্ঞানের উপর রসায়নের নির্ভরশীলতা বিবেচনা করা যেতে পারে। গণিত ব্যতীত রসায়ন বিজ্ঞানের তত্ত্ব প্রদান করা বা তত্ত্বীয় জ্ঞানার্জন অসম্ভব। রসায়নে হিসাব -নিকাশ, সূত্র প্রদান ও গাণিতিক সম্পর্ক সবই তো গণিত। কোয়ান্টাম ম্যাকানিকস (quantum mechanics), যা মূলত গাণিতিক হিসাব-নিকাশ এর সাহায্যে পরমাণুর গঠন ব্যাখ্যা করা হয়। অন্যদিকে, রসায়নের বিভিন্ন পরীক্ষণ যন্ত্র নির্ভর। এসব যন্ত্রের মূলনীতি বা পরীক্ষণ মূলনীতি পদার্থ বিজ্ঞানের উপর ভিত্তি করেই প্রতিষ্ঠিত। উপরের আলোচনা থেকে এটা বুঝা গেল যে, বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার সাথে রসায়নের শক্ত যোগসূত্র রয়েছে।

১.৪ রসায়ন পাঠের গুরুত্ব[edit]

আমরা রসায়নের পরিধি পড়ে বুঝেছি যে, মানুষের মৌলিক চাহিদা যেমন- অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার উপকরণ জোগানে রসায়ন সার্বক্ষণিকভাবে নিয়োজিত। এখানে উল্লেখ্য যে, রাসায়নিক পদার্থ মানেই ক্ষতিকারক এমন ধারণা সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মধ্যে আছে, যা ভ্রান্ত।
আমরা যা খাচ্ছি, যেমনÑ ভাত, ডাল, তেল, চিনি, লবণ এবং যা ব্যবহার করছি যেমন- সাবান, ডিটারজেন্ট, স্যাম্পু, পাউডার, ঔষধপত্র ইত্যাদি সবই রাসায়নিক পদার্থ নয় কি?
কৃষিকাজে ব্যবহৃত সার, কীটনাশক (insecticides) সবই রাসায়নিক দ্রব্যাদি। কীটনাশক ব্যবহারের মাধ্যমে পোকামাকড়কে শস্যহানি থেকে প্রতিরোধ করা হয়। আমরা মশা তাড়াবার জন্য কয়েল বা অ্যারোসল (aerosols) ব্যবহার করছি। সাবান, ডিটারজেন্ট (detergents), স্যাম্পু (shampoo) ইত্যাদি পরিষ্কার করার কাজে ব্যবহার করি। আমাদের শরীর- স্বাস্থ্য রক্ষায় ঔষধ, অ্যান্টিবায়োটিক (antibiotics), ভিটামিন (vitamins) সেবন করি।
সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক সামগ্রী যেমন- কাঁচা হলুদ, মেহেদী এবং কৃত্রিম কসমেটিকস্ (cosmetics) ও রং ব্যবহার করে থাকি। এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের ভেষজ ঔষধপত্র ও অন্যান্য সামগ্রী স্বাস্থ্যরক্ষা ও সৌন্দর্যবর্ধনের নিমিত্তে গ্রহণ করছি। কখনও কখনও অনভিজ্ঞ বা অসাধু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এসব সামগ্রী প্রস্তুত ও সরবরাহ করে থাকে। মানুষের ক্ষতির দিক বিবেচনা না করে অথবা না বুঝে অসাধুভাবে মাছ, মাংস ইত্যাদির পচনরোধে এবং ফলমূলের দ্রুত পরিপক্কতা আনায়নে বা পাকাতে নিষিদ্ধ রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার হচ্ছে। একইভাবে খাবারকে আকর্ষণীয় করে তুলতে নিষিদ্ধ ও খাবারের অনুপোযোগী (non-food grade) রং ব্যবহার করা হচ্ছে।

প্রক্রিয়াজাত খাদ্য বিশেষ করে জুস, সস, কেক, বিস্কুট প্রভৃতিতে বেশি সময় ধরে সংরক্ষণের জন্য প্রিজারভেটিভস্ (preservatives) দেওয়া হয়। প্রিজারভেটিভস ছাড়া সংগৃহীত খাদ্য স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে ঠিকই, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক ক্ষেত্রেই এসব খাদ্য সংরক্ষণে অধিকমাত্রায় নিষিদ্ধ ও খাবারের অনুপযোগী প্রিজারভেটিভস ব্যবহার করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, চুলোয় রান্না করার কাজে ব্যবহৃত তাপ, কাঠ বা প্রাকৃতিক গ্যাস পুড়িয়ে উৎপন্ন করা হয়, যেখানে বায়ুর অক্সিজেন ও কাঠ বা প্রাকৃতিক গ্যাসের বিক্রিয়া করে তাপ, কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও অন্যান্য পদার্থ উৎপন্ন করে। উল্লেখ্য, অতি স্বল্প পরিমাণ বায়ুর উপস্থিতিতে কাঠ বা প্রাকৃতিক গ্যাস পোড়ালে স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর কার্বন -ম নো -অ ক্সাইড নামক গ্যাসও তৈরি হতে পারে। এছাড়াও কাঠ ও কয়লা পোড়ালে ক্ষতিকারক কার্বন কণা (carbon particles) উৎপন্ন হয়, যা পাত্রের গায়ে জমলে তাকে আমরা ‘কালি’ বলে থাকি। একইভাবে কলকারখানা ও যান্ত্রিক যানবাহন থেকে প্রতিনিয়ত কার্বন -ডাই-অক্সাইড গ্যাস তৈরি হচ্ছে, যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
অতিরিক্ত সার, কীটনাশক, সাবান, ডিটারজেন্ট, স্যাম্পু প্রভৃতি মাটিকে এবং নদী-নালা ও খাল-বিলের পানিকে দূষিত করছে। মশার কয়েল বা অ্যারোসলের ধোঁয়া আমরা নিঃশ্বাসের সাথে গ্রহণ করি। কৃত্রিম কসমেটিকস্, রং ও ভেষজ ব্যবহার করি, যা রক্তের মাধ্যমে আমাদের শরীরের ভিতরের বিভিন্ন অংশে পৌঁছে যাচ্ছে। অন্যদিকে, তাপ বা শক্তি তৈরির সাথে উৎপন্ন কার্বন -ডাই-অক্সাইড বায়ুর সাথে মিশে পরিবেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধি করছে।

আমরা জানি, রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহারে গাছের ক্ষতি হয় বা গাছ মরে যায়। তেমনি অতি স্বল্প বায়ুর উপস্থিতিতে কাঠ বা প্রাকৃতিক গ্যাস পোড়ালে স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর কার্বন-মনো-অক্সাইড তৈরি হয়। ঔষধপত্র মাত্রাতিরিক্ত সেবনে এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। তাহলে এটা পরিষ্কার যে, ভালো ফলাফলের জন্য রাসায়নিক পদার্থের পরিমিত ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি, আর তা একমাত্র রসায়ন সম্পর্কে সুস্পষ্ট জ্ঞানই নিশ্চিত করতে পারে। অপরদিকে, রসায়ন পাঠের মাধ্যমে রাসায়নিক পদার্থের বিভিন্ন ক্ষতিকারক দিক ও ঝুঁকি সম্পর্কে জ্ঞানার্জন সম্ভব, যা আমাদেরকে সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। এর পাশাপাশি আমরা বিভিন্ন সামগ্রী ব্যবহারকারী এবং প্রস্তুতকারী উভয়ে রাসায়নিক পদার্থের গুণাগুণ বিবেচনাপূর্বক এদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে সমাজ ও পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারি। তাহলে এটা স্পষ্ট যে, প্রত্যেকের রসায়ন সম্পর্কে জ্ঞান থাকা অতীব জরুরি।

১.৫ রসায়নে অনুসন্ধান ও গবেষণা প্রক্রিয়া[edit]

কোনো বিষয় সন্মন্ধে জিজ্ঞাসা অনুসন্ধানের রূপ নেয় এবং অনুসন্ধান থেকেই গবেষণার জন্ম। যেমন- পানি সম্পর্কে যদি প্রথম প্রশ্ন হয়, এটা কী? তাহলে পরবর্তী প্রশ্নটা হবে, পানি কোথায় কোথায় পাওয়া যায়? নিশ্চয়ই এর পরে যে প্রশ্নটির উদ্রেক হবে, তা হলো- পানি কী দিয়ে গঠিত? পানি সম্পর্কে প্রথম জিজ্ঞাসাটি, দ্বিতীয়টির জন্ম দিয়েছে- পানি কোথায় পাওয়া যায়? উত্তরটি অনুসন্ধানের মাধ্যমে জানা সম্ভব যে পানির উৎস নদী, সাগর, বৃষ্টি, ঝরনা ইত্যাদি। আর পানিতে কী কী আছে, তার জন্য গবেষণার প্রয়োজন। এভাবে আরও জিজ্ঞাসা জন্মাবে- নদীর ও সাগরের পানিতে কী কী থাকে? আমরা জানি সাগরের পানি লবণাক্ত, তাহলে পরের প্রশ্নটি হতে পারে, সাগরের পানি থেকে কীভাবে সুপেয় পানি পাওয়া যেতে পারে? এটা স্পষ্ট হলো যে, এভাবেই কোনো বিষয়ের উপর অনুসন্ধান ও গবেষণা একে অপরের সাথে সম্পর্কিত এবং তা গাছের মতো শাখা -প্রশাখায় বিস্তৃতি লাভ করে। নিম্নে অনুসন্ধান ও গবেষণা কাজের বিভিন্ন ধাপসমূহের আলোচনা করা হলো।

অনুসন্ধান ও গবেষণা প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ হলো- বিষয়বস্তু নির্ধারণ বা সমস্যা চিহ্নিত করা। বিষয়বস্তু নির্ধারণ গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য যা সমাজ তথা মানবকল্যাণে দরকার বা ভবিষ্যতে দরকার হতে পারে- এমন চিন্তা করে অনুসন্ধান ও গবেষণার বিষয়বস্তু নির্ধারণ করা হয়। যেমন- পৃথিবীতে সুপেয় পানির মারাত্মক সংকট, যদিও আমাদের দেশে ততটা বুঝা যায় না। তাহলে সুপেয় পানির অনুসন্ধান করা এবং পানির অন্যান্য উৎস থেকে সুপেয় পানি পাওয়ার জন্য গবেষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বটে। অন্যদিকে, পৃথিবীতে খনিজ জ্বালানি (fossil fuels) যেমন- প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা, পেট্রোলিয়াম ইত্যাদির মজুদ কমে আসছে এবং বলা হয় যে, আগামী একশ বছরে তা ফুরিয়ে যাবে। ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে বিকল্প জ্বালানির অনুসন্ধান ও গবেষণা একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিষয়বস্তু নির্ধারণের সময় পরিবেশ, সামাজিক আচার বা ধর্মীয় অনুভূতির কথাও বিবেচনা করা হয়। অনুসন্ধানের বিষয়বস্তু ঠিক হলে অনুসন্ধান কাজকে সফল করার জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন, অনুমিত সিদ্ধান্ত গঠন ও পরীক্ষণ করা হয়। বিষয়বস্তু সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ, পরীক্ষণের জন্য রাসায়নিক ও অন্যান্য উপকরণ সংগ্রহ, পরীক্ষণের ফলে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত (data) সংগ্রহ, বিশ্লেষণ (analysis) ও ব্যাখ্যা (explanation)) প্রদান এবং ফলাফল গ্রহণও অনুসন্ধান কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট।

Rosayon. chok, 1.5.jpg

দ্বিতীয় ধাপটি হলো- বিষয়বস্তু সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান অর্জন করা। অনুসন্ধান ও গবেষণার ফলে উদ্ভাবিত বস্তু মানবকল্যাণ ব্যতীত আর কোন কোন কাজে ব্যবহৃত হতে পারে, প্রয়োজনীয় পরীক্ষার জন্য ব্যবহৃত পদার্থ স্বাস্থ্য ও পরিবেশের কী ক্ষতি করতে পারে, অনুসন্ধান ও গবেষণার বিভিন্ন ধাপের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা সম্পর্কে ও পরীক্ষার সময় যে কোনো অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি সামাল দেয়ার মতো যথেষ্ট জ্ঞানার্জন ও দক্ষতা আবশ্যক। বিষয়বস্তু ও বিষয়বস্তু উপর পরীক্ষণ সংক্রান্ত পূর্বে প্রকাশিত বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ করা অনুসন্ধানের কাজের প্রথম শর্ত। যেমন ধর, আমরা সাইট্রিক এসিডযুক্ত ফলের অনুসন্ধান করতে চাই। তাহলে কোন-জাতীয় ফ লে সাইট্রিক এসিড থাকতে পারে তার ধারণা বইপত্রে বা বৈজ্ঞানিক জার্নালে (scientific journals) প্রকাশিত তথ্য থেকে জানতে হবে। সাথে সাথে সাইট্রিক এসিড নামক পদার্থটি সম্ভাব্য কী কী পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করা যেতে পারে সে তথ্যও সংগ্রহ করতে হবে। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে অনুমিত সিদ্ধান্ত (hypothesis) গঠন করা যে, কোন কোন ফলগুলোতে সাইট্রিক এসিড থাকতে পারে এবং কোন কোন পরীক্ষাগুলোর দ্বারা সাইট্রিক এসিড (citric acid) শনাক্ত করা যায়। পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে, ন্যূনতম কোন কোন পরীক্ষা না করলে সাইট্রিক এসিডের শনাক্তকরণ পূর্ণাঙ্গ হবে না এবং চিহ্নিত পরীক্ষাপদ্ধতিগুলো থেকে বাছাইপূর্বক সেগুলোই বিবেচনায় নেয়া উচিত যেগুলোর প্রয়োজনীয় উপকরণ সহজলভ্য ও পরিবেশবান্ধব।

কাজের পরিকল্পনা প্রণয়ন করা অনুসন্ধান ও গবেষণা প্রক্রিয়ার তৃতীয় ধাপ। বিষয়বস্তু সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান ও অনুমিত সিদ্ধান্ত গঠন কাজের পরিকল্পনা প্রণয়নকে সহজতর করে। অনুসন্ধান ও গবেষণা প্রক্রিয়ার সুবিধার্থে পরিকল্পনা প্রণয়ন এলোমেলো ভাবে না করে ক্রমাণুসারে করা বাঞ্ছনীয়। অর্থাৎ যে কাজের ধারণা ছাড়া পরের কাজ শুরু বা কাজের ব্যাখ্যা করা যাবে না সেটাকে আগে রেখে পরের কাজটি পরিকল্পনায় নেয়া হয়।
গবেষণার প্রত্যাশিত ফলাফল সম্পর্কে আগাম ধারণা করা অনুসন্ধান ও গবেষণা প্রক্রিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কোনো পরীক্ষণের ফলাফল সম্পর্কে আগেই ধারণা থাকলে প্রাপ্ত ফলাফল নিয়ে অযথা কৌতূহল সৃষ্টি হবে না, তাতে করে কাজের পরের ধাপটিতে অগ্রসর হওয়া দ্রুত ও সহজ হবে। এছাড়াও ফলাফল সম্পর্কে আগাম ধারণা করতে পারলে কাজের পরিকল্পনা প্রণয়নেও সুবিধা হয়, অর্থাৎ কোনো কাজের ফলাফলের উপর ভিত্তি করে পরের কাজটির পরিকল্পনা কেমন হওয়া উচিত সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
রসায়নে অনুসন্ধান ও গবেষণা প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রেই পরীক্ষণনির্ভর, তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরীক্ষণের পরিবর্তে প্রশ্নমালার মাধ্যমে তথ্য -উপাত্ত সংগ্রহ করা যায়। পরীক্ষণ ও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ সর্বজন গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি মেনে করা হয়। যাতে করে প্রাপ্ত তথ্য-উপা ত্ত সবার কাছে বোধগম্য হয়। এর পরের ধাপটি হলো- তথ ্য ও উপাত্তের সংগঠন (যাছাই-বাছাই) ও বিশ্লেষণ করা। প্রাপ্ত ফলাফলের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রদানপূর্বক কোন অংশটি গ্রহণীয় আর কোন অংশটি বর্জনীয় তার একটি চিত্র তুলে ধরা হয়।
অনুসন্ধান ও গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল বিজ্ঞান এবং মানবকল্যাণে কী প্রভাব ফেলবে তার সম্পর্কে আলোচনা থাকা অনুসন্ধান ও গবেষণা প্রক্রিয়ার আরেকটি অংশ। প্রাপ্ত ফলাফল বিজ্ঞানের কোন মৌলিক বিষয়টির নতুন ব্যাখ্যা প্রদান করবে বা বিজ্ঞানের কোন অংশটি সহজে বুঝতে সহায়তা করবে তা উল্লেখ করতে হয়। বিষয়বস্তুর নির্ধারণ মানুষের কোন কোন কল্যাণের আসবে সুনির্দিষ্টভাবে তার দিক-নি র্দেশনা দেওয়া হয়। এ ধরনের আলোচনার মাধ্যমে অনুসন্ধান ও গবেষণা কাজের বিষয়বস্তুর গুরুত্ব ফুটে উঠে।
উপরের আলোচনা থেকে এটা বুঝা যায় যে, অনুসন্ধান ও গবেষণা প্রক্রিয়া সুর্নিদিষ্ট পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে করা হয় এবং একটি ধাপ অপরটির সম্পূরক।
এসো আমরা এবার দলগতভাবে একটা অনুসন্ধানমূলক কাজ করি। প্রতিটি দল পৃথকভাবে কমপক্ষে দশটি ফলের/সবজির নাম বের কর যেগুলোতে জৈব এসিড থাকতে পারে এবং নামগুলো ছক -১.৬ -এ লিপিবদ্ধ কর। তোমাদের সুবিধার্থে একটি ইঙ্গিত হলো, এসিডের স্বাদ টক হয়। এসিডের উপস্থিতি শিক্ষকের সহায়তায় লিটমাস পেপারের সাহায্যে নিশ্চিত কর।
ছক-১.৬ : দলগতভাবে পূরণ কর।

1.___ 2.___ 3.___
4.___ 5.___ 6.___
7.___ 8.___ 9.___
10.___

১.৬ রসায়নে অনুসন্ধানের সময়ে রাসায়নিক দ্রব্য সংরক্ষণ ও ব্যবহারে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা[edit]

পরীক্ষণ ছাড়া রসায়নে যেমন অনুসন্ধান ও গবেষণা করা কঠিন, তেমনি রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার ব্যতীত রসায়নে পরীক্ষণ সাধারণত করা হয় না। অনেক রাসায়নিক পদার্থই স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মারাত্মক ক্ষতি করে থাকে। অনেক দ্রব্য আছে যারা অতি সহজেই বিস্ফোরিত হতে পারে, বিষাক্ত, দাহ্য, স্বাস্থ্যসংবেদনশীল এবং ক্যান্সার সৃষ্টিকারী। তাহলে রাসায়নিক দ্রব্য সংগ্রহ এবং তা দিয়ে পরীক্ষণের পূর্বেই তার কার্যকারিতা সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান থাকা খুবই জরুরি।
সারাবিশ্বে পরীক্ষাগার বা গবেষণাগার, শিল্প-কারখানা, কৃষি, চিকিৎসা প্রভৃতি ক্ষেত্রে রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার তথা রাসায়নিক দ্রব্যের বাণিজ্য বেড়ে যাওয়ায় এদের সংরক্ষণ ও ব্যবহারের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা জরুরি হয়ে পড়ে। এ সংক্রান্ত একটি সার্বজনীন নিয়ম (Globally Harmonized System) চালুর বিষয়কে সামনে রেখে ১৯৯২ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে পরিবেশ ও উন্নয়ন নামে একটি সম্মিলন অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সম্মিলনের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল- (ক) রাসায়নিক পদার্থকে ঝুঁকি ও ঝুঁকির মাত্রার ভিত্তিতে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা, (খ) ঝুঁকির সতর্কতা সংক্রান্ত তথ্য- উপাত্ত (ডাটাবেজ) তৈরি করা এবং (গ) ঝুঁকি (hazard) ও ঝুঁকির মাত্রা বুঝাবার জন্য সার্বজনীন সাংকেতিক চিহ্ন নির্ধারণ করা। উদাহরণস্বরূপ কয়েকটি সাংকেতিক চিহ্ন ছক-১.৭ -এ আলোচনা করা হলো।
কোনো রাসায়নিক দ্রব্য সরবরাহ বা সংরক্ষণ করতে হলে তার পাত্রের গায়ে লেবেলের সাহায্যে শ্রেণিভেদ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সাংকেতিক চিহ্ন প্রদান করা অবশ্যই বাঞ্ছনীয়। তাহলে ব্যবহারকারী সহজেই কোনো রাসায়নিক দ্রব্যের পাত্রের গায়ে লেবেল দেখেই এর কার্যকারিতা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা নিতে পারবে এবং এর কার্যকারিতার ঝুঁকি মাথায় রেখে সংরক্ষণ ও ব্যবহার করতে পারবে। যেমন বিপদজনক সাংকেতিক চিহ্ন সংবলিত কোনো পাত্রের গায়ের লেবেল (label) দেখে এটা বুঝা যাবে যে, পাত্রের রাসায়নিক দ্রব্যটি একটি মারাত্মক বিষাক্ত পদার্থ (ছক- ১.৭ দেখ)। সাথে সাথে ব্যবহারকারীর মাথায় এটাও কাজ করবে যে ব্যবহারের সময় অবশ্যই বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে, যাতে এটা শরীরের ভিতরে প্রবেশ করতে না পারে। এছাড়াও পরীক্ষার পর পরীক্ষণ মিশ্রণ উন্মুক্ত পরিবেশ ফেলে দেওয়া যাবে কি না বা পরিশোধন করতে হবে কি না, সে সম্পর্কে ধারণা নিতে পারবে। সংগৃহীত রাসায়নিক দ্রব্য কোথায়, কীভাবে সংরক্ষণ করলে রাসায়নিক দ্রব্যের মান ঠিক থাকবে ও অনাকাক্সিক্ষত দূর্ঘটনা এড়ানো যাবে, সেসব ধারণাও পাওয়া যাবে।
ছক-১.৭ : রাসায়নিক দ্রব্যের ঝুঁকি ও ঝুঁকির মাত্রা বুঝার জন্য নির্ধারিত সাংকেতিক চিহ্ন, ঝুঁকি, ঝুঁকির মাত্রা ও সাবধানতা ।

Rosayon. chok, 1.7.A.jpg
Rosayon. chok, 1.7.B.jpg

ধর একটি বোতলের গায়ের লেবেলে নিম্নের চিহ্ন (ছক-১.৮) দেওয়া আছে। এবার উপরে প্রদত্ত তথ্য (ছক ১.৮) থেকে শ্রেণিকক্ষে বসেই নিজেরা চিহ্ন দ্বারা ব্যক্ত সম্ভাব্য ঝুঁকি ও ঝুঁকির মাত্রার বর্ণনা করার চেষ্টা কর।
ছক-১.৮ : শিখনফলের মাধ্যমে তোমরা নিজেরা পূরণ কর।

Rosayon. chok, 1.7.C.jpg

Share your opinion