Difference between revisions of "রসায়ন ও শক্তি"

From Notun boi
Jump to: navigation, search
(Tag: Mobile edit)
(Tag: Mobile edit)
 
Line 59: Line 59:
 
স্থিত রাসায়নিক শক্তির চেয়ে কম। সহজে বলা যায়, বিক্রিয়কের মধ্যে স্থিত মোট রাসায়নিক শক্তি নতুন যৌগ গঠনে
 
স্থিত রাসায়নিক শক্তির চেয়ে কম। সহজে বলা যায়, বিক্রিয়কের মধ্যে স্থিত মোট রাসায়নিক শক্তি নতুন যৌগ গঠনে
 
ব্যয় হওয়ার পর অতিরিক্ত অংশ তাপ হিসেবে বের হয়, অর্থাৎ নির্গত তাপশক্তি = উৎপাদ যৌগসমূহের মোট শক্তি (E<sub>2</sub>)
 
ব্যয় হওয়ার পর অতিরিক্ত অংশ তাপ হিসেবে বের হয়, অর্থাৎ নির্গত তাপশক্তি = উৎপাদ যৌগসমূহের মোট শক্তি (E<sub>2</sub>)
− বিক্রিয়ক যৌগসমূহের মোট শক্তি (E<sub>1</sub>)।<br>
+
− বিক্রিয়ক যৌগসমূহের মোট শক্তি (E<sub>1</sub>)।<br><br>
১০৮ রসায়ন<br>
+
১০৮ রসায়ন<br><br>
 
'''বিক্রিয়া তাপ:''' কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় পরিবর্তিত তাপকে বিক্রিয়া তাপ বলে।<br>
 
'''বিক্রিয়া তাপ:''' কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় পরিবর্তিত তাপকে বিক্রিয়া তাপ বলে।<br>
'''দহন তাপ:''' এক মোল পরিমাণ পদার্থকে দহন করলে যে তাপের উৎপন্ন হয় তাকে দহন তাপ বলে।<br>
+
'''দহন তাপ:''' এক মোল পরিমাণ পদার্থকে দহন করলে যে তাপের উৎপন্ন হয় তাকে দহন তাপ বলে।<br><br>
'''তাপহারী বিক্রিয়া:''' যে রাসায়নিক বিক্রিয়া সংঘটিত হওয়ার জন্য তাপের শোষণ ঘটে, তাকে তাপহারী বিক্রিয়া বলে।
+
'''তাপহারী বিক্রিয়া:''' যে রাসায়নিক বিক্রিয়া সংঘটিত হওয়ার জন্য তাপের শোষণ ঘটে, তাকে তাপহারী বিক্রিয়া বলে।<br>
 
তাপউৎপাদী বিক্রিয়ার ক্ষেত্রে আমরা সচরাচর তাপের উদ্ভব প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করি, কিন্তু তাপহারী বিক্রিয়া ক্ষেত্রে খুব
 
তাপউৎপাদী বিক্রিয়ার ক্ষেত্রে আমরা সচরাচর তাপের উদ্ভব প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করি, কিন্তু তাপহারী বিক্রিয়া ক্ষেত্রে খুব
 
কমই তাপ শোষণের ঘটনা বুঝতে পারি। এবার চল, তাপ শোষণ হয়েছে এমন ঘটনা বুঝবার চেষ্টা করি। 60° সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় অর্ধেক গ্লাস গরম পানি আছে। এর মধ্যে একটুকরা বরফ যোগ কর। নিশ্চয়ই আমরা বুঝতে পারি
 
কমই তাপ শোষণের ঘটনা বুঝতে পারি। এবার চল, তাপ শোষণ হয়েছে এমন ঘটনা বুঝবার চেষ্টা করি। 60° সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় অর্ধেক গ্লাস গরম পানি আছে। এর মধ্যে একটুকরা বরফ যোগ কর। নিশ্চয়ই আমরা বুঝতে পারি
Line 85: Line 85:
 
চিত্র-৮.২:তাপহারী বিক্রিয়া।
 
চিত্র-৮.২:তাপহারী বিক্রিয়া।
 
তাপ<br>
 
তাপ<br>
রসায়ন ১১৩<br>
+
রসায়ন ১১৩<br><br>
 
সালফার ও নাইট্রোজেন মৌলযুক্ত যৌগ থাকে, তাহলে জ্বালানি পোড়ানোর সময় পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ
 
সালফার ও নাইট্রোজেন মৌলযুক্ত যৌগ থাকে, তাহলে জ্বালানি পোড়ানোর সময় পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ
 
সালফার ও নাইট্রোজেনের বিভিন্ন অক্সাইড উৎপন্ন হয়। সালফার-ডাই-অক্সাইড বায়ুর জলীয়বাষ্পের সাথে যুক্ত হয়ে
 
সালফার ও নাইট্রোজেনের বিভিন্ন অক্সাইড উৎপন্ন হয়। সালফার-ডাই-অক্সাইড বায়ুর জলীয়বাষ্পের সাথে যুক্ত হয়ে
Line 94: Line 94:
 
ধোঁয়া’ (photochemical smog) বলে। ফটোক্যামিক্যাল ধোঁয়ার উপাদান গ্যাসসমূহ বায়ুমণ্ডলের ওজোন
 
ধোঁয়া’ (photochemical smog) বলে। ফটোক্যামিক্যাল ধোঁয়ার উপাদান গ্যাসসমূহ বায়ুমণ্ডলের ওজোন
 
(O<sub>3</sub>) স্তরের মারাত্মক ক্ষয়সাধন করে। অতএব স্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষায় বিশুদ্ধ জ্বালানির ব্যবহার নিশ্চিত
 
(O<sub>3</sub>) স্তরের মারাত্মক ক্ষয়সাধন করে। অতএব স্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষায় বিশুদ্ধ জ্বালানির ব্যবহার নিশ্চিত
করা অত্যন্ত জরুরি।
+
করা অত্যন্ত জরুরি।<br><br>
৮.৬ রাসায়নিক শক্তি ব্যবহারের নেতিবাচক প্রভাব
+
'''৮.৬ রাসায়নিক শক্তি ব্যবহারের নেতিবাচক প্রভাব'''<br>
 
আমরা উপরে দেখলাম যে, রাসায়নিক শক্তির ব্যবহার উপযোগী করার মূলনীতি মূলত জ্বালানিকে বায়ুর সাথে পুড়িয়ে
 
আমরা উপরে দেখলাম যে, রাসায়নিক শক্তির ব্যবহার উপযোগী করার মূলনীতি মূলত জ্বালানিকে বায়ুর সাথে পুড়িয়ে
 
(জারণ বিক্রিয়া) তাপ উৎপন্ন করা। যদিও ফুয়েল সেল ও অন্যান্য ক্ষেত্রে বিশেষ করে বিভিন্ন তড়িৎ রাসায়নিক কোষ ও
 
(জারণ বিক্রিয়া) তাপ উৎপন্ন করা। যদিও ফুয়েল সেল ও অন্যান্য ক্ষেত্রে বিশেষ করে বিভিন্ন তড়িৎ রাসায়নিক কোষ ও
Line 112: Line 112:
 
তাছাড়াও এসব গ্যাস ওজোনস্তরের সাথে সরাসরি বিক্রিয়া করে এর পুরুত্ব কমিয়ে দিচ্ছে বা ওজোনস্তরে ক্ষতের (hole) সৃষ্টি করছে। আসলে ওজোনস্তর সূর্যের আলোর ছাঁকনি হিসেবে কাজ করে সূর্যের আলোতে উপস্থিত
 
তাছাড়াও এসব গ্যাস ওজোনস্তরের সাথে সরাসরি বিক্রিয়া করে এর পুরুত্ব কমিয়ে দিচ্ছে বা ওজোনস্তরে ক্ষতের (hole) সৃষ্টি করছে। আসলে ওজোনস্তর সূর্যের আলোর ছাঁকনি হিসেবে কাজ করে সূর্যের আলোতে উপস্থিত
 
অতিবেগুনি রশ্মি (ultraviolet ray) পৃথিবীতে আসতে বাধা প্রদান করে। পরবর্তী শ্রেণিতে আমরা এদের প্রভাবে কী
 
অতিবেগুনি রশ্মি (ultraviolet ray) পৃথিবীতে আসতে বাধা প্রদান করে। পরবর্তী শ্রেণিতে আমরা এদের প্রভাবে কী
কী হতে পারে তার বিস্তারিত জানব।<br>
+
কী হতে পারে তার বিস্তারিত জানব।<br><br>
১১৪ রসায়ন<br>
+
১১৪ রসায়ন<br><br>
 
চিত্র-৮.৮: কারখানা থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের নিঃসরণ (বামে) ও বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে মেরু অঞ্চলের
 
চিত্র-৮.৮: কারখানা থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের নিঃসরণ (বামে) ও বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে মেরু অঞ্চলের
বরফ গলে পানি হচ্ছে (ডানে)।<Br>
+
বরফ গলে পানি হচ্ছে (ডানে)।<br><br>
৮.৭ ইথানলকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার
+
'''৮.৭ ইথানলকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার'''<br>
 
ইথানল, যার অপর নাম ইথাইল অ্যালকোহল- এটি একটি দাহ্য তরল রাসায়নিক পদার্থ। খনিজ জ্বালানি যেমন- কেরোসিন, পেট্রোল, ডিজেল প্রভৃতির মতো ইথানলকে পোড়ালে তাপ উৎপন্ন হয়। তাহলে খনিজ জ্বালানির মতো
 
ইথানল, যার অপর নাম ইথাইল অ্যালকোহল- এটি একটি দাহ্য তরল রাসায়নিক পদার্থ। খনিজ জ্বালানি যেমন- কেরোসিন, পেট্রোল, ডিজেল প্রভৃতির মতো ইথানলকে পোড়ালে তাপ উৎপন্ন হয়। তাহলে খনিজ জ্বালানির মতো
 
ইথানলকে তাপ ইঞ্জিনের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে কলকারখানা, গাড়ি, বিমান, জাহাজ প্রভৃতি চালানো যেতে
 
ইথানলকে তাপ ইঞ্জিনের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে কলকারখানা, গাড়ি, বিমান, জাহাজ প্রভৃতি চালানো যেতে
Line 133: Line 133:
 
উৎপাদন করাও সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে, কৃষিকাজের মাধ্যমে শস্য ও উদ্ভিদ তথা ইথানলের নিয়মিতভাবে উৎপাদন
 
উৎপাদন করাও সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে, কৃষিকাজের মাধ্যমে শস্য ও উদ্ভিদ তথা ইথানলের নিয়মিতভাবে উৎপাদন
 
নিশ্চিত করা সম্ভব। অতএব খনিজ জ্বালানির মতো ইথানল ফুরাবার ভয় নেই। তাহলে, ইথানলের বাণিজ্যিক উৎপাদন ও
 
নিশ্চিত করা সম্ভব। অতএব খনিজ জ্বালানির মতো ইথানল ফুরাবার ভয় নেই। তাহলে, ইথানলের বাণিজ্যিক উৎপাদন ও
বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের প্রযুক্তি উদ্ভাবন একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।<br>
+
বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের প্রযুক্তি উদ্ভাবন একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।<br><br>
 
'''৮.৮ তড়িৎ রাসায়নিক কোষ (Electrochemical cell)'''<br>
 
'''৮.৮ তড়িৎ রাসায়নিক কোষ (Electrochemical cell)'''<br>
 
উপরে আমরা জানলাম যে, জ্বালানিকে পুড়িয়ে রাসায়নিক শক্তিকে তাপশক্তিতে পরিণত করে বিভিন্নভাবে কাজে লাগানো
 
উপরে আমরা জানলাম যে, জ্বালানিকে পুড়িয়ে রাসায়নিক শক্তিকে তাপশক্তিতে পরিণত করে বিভিন্নভাবে কাজে লাগানো
 
যায়। এখানে আমরা শিখব কীভাবে রাসায়নিক শক্তিকে তাপশক্তিতে রূপান্তরিত না করে সরাসরি বিদ্যুৎশক্তিতে পরিণত
 
যায়। এখানে আমরা শিখব কীভাবে রাসায়নিক শক্তিকে তাপশক্তিতে রূপান্তরিত না করে সরাসরি বিদ্যুৎশক্তিতে পরিণত
করা যায় ও পাশাপাশি কীভাবে বিদ্যুৎশক্তিকে ব্যবহার করে রাসায়নিক বিক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়। গ্যালভানি (Luigi <br>
+
করা যায় ও পাশাপাশি কীভাবে বিদ্যুৎশক্তিকে ব্যবহার করে রাসায়নিক বিক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়। গ্যালভানি (Luigi <br><br>
রসায়ন ১১৫<br>
+
রসায়ন ১১৫<br><br>
 
Galvani) ও ভোলটা (Alessandro Volta) প্রথম রাসায়নিক শক্তিকে বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তরিত করতে সক্ষম
 
Galvani) ও ভোলটা (Alessandro Volta) প্রথম রাসায়নিক শক্তিকে বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তরিত করতে সক্ষম
 
হয়েছিলেন। গ্যালভানি ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে ও ভোলটা ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে আলাদাভাবে পরীক্ষার মাধ্যমে বুঝতে পারেন যে,
 
হয়েছিলেন। গ্যালভানি ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে ও ভোলটা ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে আলাদাভাবে পরীক্ষার মাধ্যমে বুঝতে পারেন যে,
Line 146: Line 146:
 
মাধ্যমে রাসায়নিক বিক্রিয়া সংঘটিত করা যায়। একে তড়িৎ বিশ্লেষণ (electrolysis) বলা হয়। যে কোষে তড়িৎ
 
মাধ্যমে রাসায়নিক বিক্রিয়া সংঘটিত করা যায়। একে তড়িৎ বিশ্লেষণ (electrolysis) বলা হয়। যে কোষে তড়িৎ
 
বিশ্লেষণ করা হয় তাকে তড়িৎ বিশ্লেষ্য কোষ (electrolytic cell) বলে। তড়িৎ রাসায়নিক কোষ বিভিন্ন ক্ষুদ্রাংশ,
 
বিশ্লেষণ করা হয় তাকে তড়িৎ বিশ্লেষ্য কোষ (electrolytic cell) বলে। তড়িৎ রাসায়নিক কোষ বিভিন্ন ক্ষুদ্রাংশ,
যেমন তড়িৎদ্বার (electrode), লবণ- সেতু (salt bridge) ও তড়িৎ বিশ্লেষ্য দ্রবণ নিয়ে গঠিত। নিম্নে তড়িৎ রাসায়নিক কোষের বিভিন্ন বিষয়ের আলোচনা করা হলো।<br>
+
যেমন তড়িৎদ্বার (electrode), লবণ- সেতু (salt bridge) ও তড়িৎ বিশ্লেষ্য দ্রবণ নিয়ে গঠিত। নিম্নে তড়িৎ রাসায়নিক কোষের বিভিন্ন বিষয়ের আলোচনা করা হলো।<br><br>
 
'''৮.৯ বিদ্যুৎ পরিবাহী ও তড়িৎদ্বার'''<br>
 
'''৮.৯ বিদ্যুৎ পরিবাহী ও তড়িৎদ্বার'''<br>
 
'''পরিবাহী:''' যে সকল পদার্থের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হতে পারে, তাদেরকে বিদ্যুৎ পরিবাহী (conductor) বলে। আর
 
'''পরিবাহী:''' যে সকল পদার্থের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হতে পারে, তাদেরকে বিদ্যুৎ পরিবাহী (conductor) বলে। আর
Line 154: Line 154:
 
তড়িৎ বিশ্লেষ্য (electrolytic) পরিবাহী। যে সকল পরিবাহী ইলেকট্রন প্রবাহের মাধ্যমে বিদ্যুৎ প্রবাহিত করে তাকে
 
তড়িৎ বিশ্লেষ্য (electrolytic) পরিবাহী। যে সকল পরিবাহী ইলেকট্রন প্রবাহের মাধ্যমে বিদ্যুৎ প্রবাহিত করে তাকে
 
ইলেকট্রনিক পরিবাহী বলে। যেমনঃ- সকল ধাতু ও গ্রাফাইট। বিদ্যুৎপ্রবাহ যদি পরিবাহীর আয়ন দ্বারা সাধিত হয়, ঐসব
 
ইলেকট্রনিক পরিবাহী বলে। যেমনঃ- সকল ধাতু ও গ্রাফাইট। বিদ্যুৎপ্রবাহ যদি পরিবাহীর আয়ন দ্বারা সাধিত হয়, ঐসব
পরিবাহীকে তড়িৎ বিশ্লেষ্য পরিবাহী বলে। যেমনঃ-গলিত লবণ, এসিড, ক্ষার ও লবণের দ্রবণ।<br>
+
পরিবাহীকে তড়িৎ বিশ্লেষ্য পরিবাহী বলে। যেমনঃ-গলিত লবণ, এসিড, ক্ষার ও লবণের দ্রবণ।<br><br>
 
'''তড়িৎদ্বার:''' তড়িৎদ্বার হলো ধাতব বা অধাতব বিদ্যুৎ পরিবাহী পদার্থ। এদেরকে ইলেকট্রনিক পরিবাহী বলা হয়। তড়িৎদ্বার
 
'''তড়িৎদ্বার:''' তড়িৎদ্বার হলো ধাতব বা অধাতব বিদ্যুৎ পরিবাহী পদার্থ। এদেরকে ইলেকট্রনিক পরিবাহী বলা হয়। তড়িৎদ্বার
 
তড়িৎ রাসায়নিক কোষের ইলেকট্রনিক পরিবাহী ও দ্রবণের (আয়নিক পরিবাহী) মধ্যে বিদ্যুৎ প্রবাহের যোগসূত্র রক্ষা
 
তড়িৎ রাসায়নিক কোষের ইলেকট্রনিক পরিবাহী ও দ্রবণের (আয়নিক পরিবাহী) মধ্যে বিদ্যুৎ প্রবাহের যোগসূত্র রক্ষা
Line 168: Line 168:
 
ধনাত্মক প্রান্ত যে ধাতব দণ্ডের সাথে যুক্ত তা অ্যানোড হিসেবে এবং ঋণাত্মক প্রান্ত যে ধাতব দণ্ডের সাথে যুক্ত তা
 
ধনাত্মক প্রান্ত যে ধাতব দণ্ডের সাথে যুক্ত তা অ্যানোড হিসেবে এবং ঋণাত্মক প্রান্ত যে ধাতব দণ্ডের সাথে যুক্ত তা
 
ক্যাথোড হিসেবে কাজ করে।
 
ক্যাথোড হিসেবে কাজ করে।
গ্যালভানিক কোষে অ্যানোড ও ক্যাথোড তড়িৎদ্বার গঠনের পদ্ধতি তড়িৎ বিশ্লেষ্য কোষ থেকে পৃথক। একটি ধাতব<br>
+
গ্যালভানিক কোষে অ্যানোড ও ক্যাথোড তড়িৎদ্বার গঠনের পদ্ধতি তড়িৎ বিশ্লেষ্য কোষ থেকে পৃথক। একটি ধাতব<br><br>
১১৬ রসায়ন<br>
+
১১৬ রসায়ন<br><br>
 
দণ্ডকে ঐ ধাতুর তড়িৎ বিশ্লেষ্য দ্রবণের মধ্যে স্থাপন করে তড়িৎদ্বার গঠন করা হয়। গ্যালভানিক কোষের অ্যানোড ও
 
দণ্ডকে ঐ ধাতুর তড়িৎ বিশ্লেষ্য দ্রবণের মধ্যে স্থাপন করে তড়িৎদ্বার গঠন করা হয়। গ্যালভানিক কোষের অ্যানোড ও
 
ক্যাথোড হিসেবে ভিন্ন ধাতব দণ্ডকে ব্যবহার করা হয় (একই ধাতব দণ্ডকে ভিন্ন ঘনমাত্রার তড়িৎ বিশ্লেষ্যের মধ্যে
 
ক্যাথোড হিসেবে ভিন্ন ধাতব দণ্ডকে ব্যবহার করা হয় (একই ধাতব দণ্ডকে ভিন্ন ঘনমাত্রার তড়িৎ বিশ্লেষ্যের মধ্যে
 
স্থাপন করে অ্যানোড ও ক্যাথোড গঠন করা যায়। এই সম্পর্কে পরবর্তী শ্রেণিতে জানবে)। গ্যালভানিক কোষের অ্যানোড ও ক্যাথোড নির্ধারিত হয় ধাতুর সক্রিয়তা দ্বারা। তড়িৎদ্বার হিসেবে ব্যবহৃত ধাতব দণ্ডদ্বয়ের মধ্যে অধিক সক্রিয়
 
স্থাপন করে অ্যানোড ও ক্যাথোড গঠন করা যায়। এই সম্পর্কে পরবর্তী শ্রেণিতে জানবে)। গ্যালভানিক কোষের অ্যানোড ও ক্যাথোড নির্ধারিত হয় ধাতুর সক্রিয়তা দ্বারা। তড়িৎদ্বার হিসেবে ব্যবহৃত ধাতব দণ্ডদ্বয়ের মধ্যে অধিক সক্রিয়
ধাতু অ্যানোড এবং কম সক্রিয় ধাতু ক্যাথোড হিসেবে কাজ করে।<br>
+
ধাতু অ্যানোড এবং কম সক্রিয় ধাতু ক্যাথোড হিসেবে কাজ করে।<br><br>
 
'''ধাতু/ধাতব আয়ন তড়িৎদ্বার'''<br>
 
'''ধাতু/ধাতব আয়ন তড়িৎদ্বার'''<br>
 
বিভিন্ন প্রকারের তড়িৎদ্বার রয়েছে। তন্মধ্যে ধাতু/ধাতব আয়ন তড়িৎদ্বার অন্যতম। কোনো একটি ধাতু যদি উক্ত ধাতুর
 
বিভিন্ন প্রকারের তড়িৎদ্বার রয়েছে। তন্মধ্যে ধাতু/ধাতব আয়ন তড়িৎদ্বার অন্যতম। কোনো একটি ধাতু যদি উক্ত ধাতুর
 
লবণের দ্রবণে ডুবানো থাকে, তাহলে তাকে ধাতু/ধাতু আয়ন তড়িৎদ্বার বলেঃ যেমন: কপার ধাতুর দণ্ড বা ধাতব পাত
 
লবণের দ্রবণে ডুবানো থাকে, তাহলে তাকে ধাতু/ধাতু আয়ন তড়িৎদ্বার বলেঃ যেমন: কপার ধাতুর দণ্ড বা ধাতব পাত
 
কপার সালফেটের জলীয় দ্রবণে ডুবানো থাকে, তাহলে তাকে কপার/কপার(II) বা Cu|Cu<sup>2+</sup>(aq) তড়িৎদ্বার বলে।
 
কপার সালফেটের জলীয় দ্রবণে ডুবানো থাকে, তাহলে তাকে কপার/কপার(II) বা Cu|Cu<sup>2+</sup>(aq) তড়িৎদ্বার বলে।
অনুরূপভাবে, Ag|Ag<sup>+</sup>(aq) এবং Zn|Zn<sup>2+</sup>উল্লেখযোগ্য ধাতু/ধাতব আয়ন তড়িৎদ্বারের উদাহরণ।<br>
+
অনুরূপভাবে, Ag|Ag<sup>+</sup>(aq) এবং Zn|Zn<sup>2+</sup>উল্লেখযোগ্য ধাতু/ধাতব আয়ন তড়িৎদ্বারের উদাহরণ।<br><br>
 
'''তড়িৎদ্বার বিক্রিয়া'''<br>
 
'''তড়িৎদ্বার বিক্রিয়া'''<br>
 
উপরে আমরা ধাতু/ধাতব আয়ন তড়িৎদ্বার সম্পর্কে জেনেছি। Ag|Ag<sup>+</sup> তড়িৎদ্বারটির বিক্রিয়াকে আমরা
 
উপরে আমরা ধাতু/ধাতব আয়ন তড়িৎদ্বার সম্পর্কে জেনেছি। Ag|Ag<sup>+</sup> তড়িৎদ্বারটির বিক্রিয়াকে আমরা
Line 195: Line 195:
 
তড়িৎদ্বার বিক্রিয়া সম্পাদন করা যায়।
 
তড়িৎদ্বার বিক্রিয়া সম্পাদন করা যায়।
 
অ্যানোড বিক্রিয়া : গ → গ+ + ব¯
 
অ্যানোড বিক্রিয়া : গ → গ+ + ব¯
ক্যাথোড বিক্রিয়া : ঢ + ব¯→ ঢ¯
+
ক্যাথোড বিক্রিয়া : ঢ + ব¯→ ঢ¯<br><br>
৮.১০ গ্যালভানিক কোষ
+
'''৮.১০ গ্যালভানিক কোষ'''<br>
 
যে তড়িৎ রাসায়নিক কোষে তড়িৎদ্বার বিক্রিয়া স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটে, অর্থাৎ বিক্রিয়া সংঘটনের জন্য বাহির থেকে শক্তির
 
যে তড়িৎ রাসায়নিক কোষে তড়িৎদ্বার বিক্রিয়া স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটে, অর্থাৎ বিক্রিয়া সংঘটনের জন্য বাহির থেকে শক্তির
 
দরকার হয় না এবং রাসায়নিক শক্তি বিদ্যুৎশক্তিতে পরিণত হয়, তাকে গ্যালভানিক কোষ বলে। ড্যানিয়াল কোষ
 
দরকার হয় না এবং রাসায়নিক শক্তি বিদ্যুৎশক্তিতে পরিণত হয়, তাকে গ্যালভানিক কোষ বলে। ড্যানিয়াল কোষ
(উধহরবষ পবষষ) একটি গ্যালভানিক কোষ ড্যানিয়াল কোষ ক্যাথোড হিসেবে ঈঁ।ঈঁ২+(ধয়) ধাতু/ধাতব আয়ন
+
(Daniel cell) একটি গ্যালভানিক কোষ ড্যানিয়াল কোষ ক্যাথোড হিসেবে ঈঁ।ঈঁ২+(ধয়) ধাতু/ধাতব আয়ন
 
তড়িৎদ্বার ও অ্যানোড হিসেবে তহ।তহ২+(ধয়) ধাতু/ধাতব আয়ন তড়িৎদ্বার নিয়ে গঠিত। চিত্রে ৮.৯ -এ ড ্যানিয়াল
 
তড়িৎদ্বার ও অ্যানোড হিসেবে তহ।তহ২+(ধয়) ধাতু/ধাতব আয়ন তড়িৎদ্বার নিয়ে গঠিত। চিত্রে ৮.৯ -এ ড ্যানিয়াল
কোষের গঠন দেখানো হলো। ক্যাথোড হিসেবে একটি পাত্রে কপার দণ্ড কপার সালফেটের জলীয় দ্রবণে ডুবানো থাকে।
+
কোষের গঠন দেখানো হলো। ক্যাথোড হিসেবে একটি পাত্রে কপার দণ্ড কপার সালফেটের জলীয় দ্রবণে ডুবানো থাকে।<br><br>
রসায়ন ১১৭
+
রসায়ন ১১৭<br><br>
 
ক+ ঈষ¯
 
ক+ ঈষ¯
 
ব¯ ব¯
 
ব¯ ব¯
Line 212: Line 212:
 
জিংক (তহ)
 
জিংক (তহ)
 
অ্যানোড
 
অ্যানোড
চিত্র-৮.৯: গ্যালাভানিক কোষ।
+
চিত্র-৮.৯: গ্যালাভানিক কোষ।<br>
 
তহ(ং) + ঈঁ২+ (ধয়) → তহ২+(ধয়) + ঈঁ (ং)
 
তহ(ং) + ঈঁ২+ (ধয়) → তহ২+(ধয়) + ঈঁ (ং)
 
অন্য পাত্রে অ্যানোড হিসেবে জিংক দন্ড জিংক সালফেটের জলীয় দ্রবণে ডুবানো থাকে। পাত্রদ্বয়ের দ্রবণের মধ্যে সংযোগ
 
অন্য পাত্রে অ্যানোড হিসেবে জিংক দন্ড জিংক সালফেটের জলীয় দ্রবণে ডুবানো থাকে। পাত্রদ্বয়ের দ্রবণের মধ্যে সংযোগ
স্থাপনের জন্য নিষ্ক্রিয় তড়িৎ বিশে -ষ্য (কঈষ) দ্রবণপূর্ণ -আকৃতির টিউব দ্রবণদ্বয়ের মধ্যে ডুবানো হয়। এবার যদি
+
স্থাপনের জন্য নিষ্ক্রিয় তড়িৎ বিশ্লেষ্য (কঈষ) দ্রবণপূর্ণ U-আকৃতির টিউব দ্রবণদ্বয়ের মধ্যে ডুবানো হয়। এবার যদি
 
তারের সাহায্যে তড়িৎদ্বার দুটিকে সংযুক্ত করা হয়, তাহলে নিম্নোক্ত জারণ -বিজারণ বিি ক্রয়া স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটবে।
 
তারের সাহায্যে তড়িৎদ্বার দুটিকে সংযুক্ত করা হয়, তাহলে নিম্নোক্ত জারণ -বিজারণ বিি ক্রয়া স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটবে।
 
অ্যানোড বিক্রিয়া : তহ (ং) → তহ২+ (ধয়) + ২ব¯
 
অ্যানোড বিক্রিয়া : তহ (ং) → তহ২+ (ধয়) + ২ব¯

Latest revision as of 04:24, 22 July 2017

সূচিপত্র


রসায়নের ধারণা
পদার্থের অবস্থা
পদার্থের গঠন
পর্যায় সারণি
রাসায়নিক বন্ধন
মোলের ধারণা ও রাসায়নিক গণনা
রাসায়নিক বিক্রিয়া SSC
রসায়ন ও শক্তি
এসিড-ক্ষার সমতা
খনিজ সম্পদ ধাতু-অধাতু
খনিজ সম্পদ-জীবাশ্ম
আমাদের জীবনে রসায়ন



রাসায়নিক বন্ধন মূলত শক্তির আধার। রাসায়নিক বন্ধন ভাঙা-গড়ার সাথে শক্তি নিহিত। পৃথিবীতে যত রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে সকল ক্ষেত্রেই শক্তির রূপান্তর হয়। এই পরিবর্তনগুলোর মধ্যে যেগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটে সে পরিবর্তনের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে আমরা দৈনন্দিন কাজ করি। পৃথিবীতে এই শক্তির পরিমাণ সীমিত যা দিন দিন কমে আসছে। তাই আমাদের বিকল্প শক্তির কথা চিন্তা করা প্রয়োজন। ইতোমধ্যে সূর্যকে কাজে লাগিয়ে সোলার প্যানেল তৈরি করে বাতি জ্বালানের পরিমাণ বৃদ্ধি করার চেষ্টা চলছে। অন্য দিকে উন্নত দেশের ন্যায় পারমাণবিক শক্তিকে ব্যবহার করার প্রচেষ্টা আমাদের দেশে শুরু হয়েছে।

Ssc Rosayon L8.jpg

এই অধ্যায় পাঠ শেষে আমরা:
(১) রাসায়নিক পরিবর্তনের সাথে শক্তি উৎপাদনের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে পারব।
(২) শক্তি উৎপাদনে জ্বালানির বিশুদ্ধতার গুরুত্ব অনুধাবন, পরিবেশ সুরক্ষায় এগুলোর ব্যবহার সীমিত রাখতে ও উপযুক্ত জ্বালানি নির্বাচনে সচেতনতার পরিচয় দিতে পারব।
(৩) নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে রাসায়নিক বিক্রিয়া সংশ্লিষ্ট সমস্যা চিহ্নিত করে তা অনুসন্ধানের পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং এর কার্যকারিতা মূল্যায়ন করতে পারব।
(৪) রাসায়নিক বিক্রিয়া সংগঠনে এবং শক্তি উৎপাদনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ও আত্মবিশ্বাসের সাথে দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হব।
(৫) জারণ-বিজারণ বিিক্রয়ার ইলেকট্রনীয় মতবাদ ব্যবহার করে চল বিদ্যুতের ধারণা ব্যাখ্যা করতে পারব।
(৬) রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে পারব।
(৭) বিদ্যুৎ ব্যবহার করে বিক্রিয়া সংগঠন করতে পারব।
(৮) বিভিন্ন পদার্থের তড়িৎ বিশ্লেষণে উৎপাদিত পদার্থ এবং এর বাণিজ্যিক ব্যবহার সম্পর্কে মতামত দিতে পারব।
(৯) তড়িৎ রাসায়নিক কোষ ও গ্যালভানিক কোষের মধ্যে পার্থক্য করতে পারব।
(১০) তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্পর্কে মতামত দিতে পারব।
(১১) তাপহারী ও তাপউৎপাদী বিক্রিয়ার পরীক্ষা করতে পারব।
(১২) রাসায়নিক দ্রব্যের ক্ষতিকর দিকসমূহ সম্পর্কে সচেতনতা প্রদর্শন করতে পারব।
(১৩) বিশুদ্ধ জ্বালানি ব্যবহারে আগ্রহ প্রদর্শন করতে পারব।
(১৪) লবণ দ্রবীভূত ও রাসায়নিক পরিবর্তন হওয়ার সময় তাপের পরিবর্তন পরীক্ষার সাহায্যে দেখাতে পারব।
(১৫) গ্যালভানিক কোষের তড়িৎদ্বার গঠন করতে পারব।

১.১ রাসায়নিক শক্তি[edit]

ক. বন্ধনশক্তি ও রাসায়নিক বিক্রিয়ায় শক্তির পরিবর্তন
আমরা জেনেছি যে, কোনো যৌগে মৌলসমূহ তাদের মধ্যে পারস্পরিক (mutual) শক্তি দ্বারা যুক্ত থাকে। মৌলসমূহের একে অপরের সাথে যুক্ত হওয়ার শক্তিই হলো রাসায়নিক বন্ধন। তাছাড়াও কোনো পদার্থের অণু বা আয়নসমূহ একে অপরের সাথে নানা শক্তির সমন্বয়ে গঠিত ‘আন্তঃআণবিক শক্তি’ (intermolecular force) নামক শক্তির মাধ্যমে কাছাকাছি থেকে একটি নির্দিষ্ট অবস্থা, যেমন- কঠিন, তরল বা বায়বীয় অবস্থার সৃষ্টি করে। কোনো দ্রবের অণু বা আয়নসমূহের মধ্যে আন্তঃআণবিক শক্তি বেশি হলে- কঠিন, কম হলে- তরল ও আরও কম হলে- বায়বীয় অবস্থার সৃষ্টি হয়। তাহলে একই দ্রবের অবস্থাভেদে আন্তঃআণবিক শক্তি ভিন্নতর হয়। যেমন- বরফ, পানি ও জলীয়বাষ্প হলো- পানির কঠিন, তরল ও বায়বীয় অবস্থা। পানিকে তাপ (শক্তি) দিলে জলীয়বাষ্পের সৃষ্টি হয়, অর্থাৎ পানি তাপ শোষণ করে তরল থেকে বায়বীয় পদার্থে পরিণত হয়। আবার পানিকে ঠাণ্ডা করলে, অর্থাৎ পানি থেকে তাপ বের করে নিলে পানি কঠিন (বরফ) দ্রবে পরিণত হয়।
অন্যদিকে, রাসায়নিক বন্ধন তৈরির সাথেও শক্তি জড়িত। ভিন্ন যৌগে অণুসমূহ ভিন্ন বন্ধনশক্তি দ্বারা যুক্ত থাকে। যদি বিক্রিয়ায় উৎপন্ন যৌগের মোট শক্তি বিক্রিয়কসমূহের মোট শক্তির চেয়ে কম হয় অথবা বেশি হয় তাহলে কী হতে পারে চল ভেবে দেখা যাক। উৎপন্ন যৌগে মোট শক্তির পরিমাণ কম হলে বিক্রিয়ার ফলে শক্তির উদ্ভব হবে, এবং বেশি হলে শক্তির শোষণ ঘটবে।
মোটকথা, যে কোনো রাসায়নিক পরিবর্তনে কমবেশি শক্তির উদ্ভব বা শোষণ হয়ে থাকে, যদিও তা সবসময়ই আমরা অনুভব করতে পারি না। তাহলে এটা স্পষ্ট যে, দ্রবের অবস্থার পরিবর্তনের সাথে যেমন শক্তি জড়িত, রাসায়নিক বিক্রিয়ায় মাধ্যমে নতুন পদার্থে পরিণত হবার প্রক্রিয়ার সাথে তেমন শক্তি জড়িত।

খ. তাপ উৎপাদী বিক্রিয়া ও তাপহারী বিক্রিয়া
এবার উপরের আলোচিত বিষয়বস্তু থেকে বিক্রিয়াকে তাপের ভিত্তিতে ভাগ করি। তাপের পরিবর্তনের ভিত্তিতে রাসায়নিক বিক্রিয়া দুই প্রকার, যথা : (১) তাপ উৎপাদী ও (২) তাপহারী বিক্রিয়া ।
তাপ উৎপাদী বিক্রিয়া: যে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় তাপ উৎপন্ন হয় তাকে তাপ উৎপাদী বিক্রিয়া বলে। যেমন: কাঠ, কয়লা বা গ্যাস পোড়ালে তাপ উৎপন্ন হয়। কাঠ বা কয়লা মূলত কার্বন এবং কার্বনের বিভিন্ন যৌগ, যা দহনের মাধ্যমে বায়ুর অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে কার্বন-ডাই-অক্সাইড (CO2) ও তাপ উৎপন্ন করে। চুন পানিতে দিলে তাপ উৎপন্ন হয়। চুন হলো ক্যালসিয়াম অক্সাইড (CaO), যা পানির সাথে বিক্রিয়া করে ক্যালসিয়াম হাইড্রক্সাইড; Ca(OH)2ও তাপ উৎপন্ন করে।
C(s) + O2(g) → CO2 (g) + তাপ
CaO (s) + H2O (l) → Ca(OH)2 (aq) + তাপ
এবার তাপশক্তি নির্গত হওয়ার বিষয়সমূহ ব্যাখ্যা করা যাক। প্রথম ক্ষেত্রে, বিক্রিয়ক কার্বন ও অক্সিজেনের মধ্যে মোট স্থিত রাসায়নিক শক্তি উৎপাদিত যৌগ কার্বন-ডাই-অক্সাইড মধ্যে স্থিত রাসায়নিক শক্তির চেয়ে বেশি। অনুরূপভাবে, উৎপাদ ক্যালসিয়াম হাইড্রক্সাইড-এর মধ্যে স্থিত রাসায়নিক শক্তি বিক্রিয়ক ক্যালসিয়াম অক্সাইড ও পানির মধ্যে মোট স্থিত রাসায়নিক শক্তির চেয়ে কম। সহজে বলা যায়, বিক্রিয়কের মধ্যে স্থিত মোট রাসায়নিক শক্তি নতুন যৌগ গঠনে ব্যয় হওয়ার পর অতিরিক্ত অংশ তাপ হিসেবে বের হয়, অর্থাৎ নির্গত তাপশক্তি = উৎপাদ যৌগসমূহের মোট শক্তি (E2) − বিক্রিয়ক যৌগসমূহের মোট শক্তি (E1)।

১০৮ রসায়ন

বিক্রিয়া তাপ: কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় পরিবর্তিত তাপকে বিক্রিয়া তাপ বলে।
দহন তাপ: এক মোল পরিমাণ পদার্থকে দহন করলে যে তাপের উৎপন্ন হয় তাকে দহন তাপ বলে।

তাপহারী বিক্রিয়া: যে রাসায়নিক বিক্রিয়া সংঘটিত হওয়ার জন্য তাপের শোষণ ঘটে, তাকে তাপহারী বিক্রিয়া বলে।
তাপউৎপাদী বিক্রিয়ার ক্ষেত্রে আমরা সচরাচর তাপের উদ্ভব প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করি, কিন্তু তাপহারী বিক্রিয়া ক্ষেত্রে খুব কমই তাপ শোষণের ঘটনা বুঝতে পারি। এবার চল, তাপ শোষণ হয়েছে এমন ঘটনা বুঝবার চেষ্টা করি। 60° সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় অর্ধেক গ্লাস গরম পানি আছে। এর মধ্যে একটুকরা বরফ যোগ কর। নিশ্চয়ই আমরা বুঝতে পারি যে, কিছুক্ষণের মধ্যেই বরফটুকরাটি গলবে, আর সাথে সাথে পানির তাপমাত্রাও কমে যাবে। এভাবে সচরাচর আমরা পানীয়কে ঠাণ্ডা করতে বরফটুকরা ব্যবহার করে থাকি। আমরা উপরে জেনেছি যে, পানি থেকে শক্তি বের করলে পানি তরল থেকে কঠিনে (বরফে) পরিণত হয়। তাহলে এটা স্পষ্ট যে, গৃহীত শক্তি (তাপ) বরফকে ফেরত দিলে কঠিন বরফ তরল পানিতে পরিণত হবে। প্রকৃতপক্ষে, গ্যাসে রাখা বরফটুকরাটি গরম পানি থেকে তাপ (শক্তি) গ্রহণ করে পানিতে পরিণত হয়। তার ফলে গরম পানির তাপমাত্রা কমে যায়। তাহলে বরফটুকরা তার চারপাশ (পরিবেশ) থেকে তাপ শোষণ করে পানিতে পরিণত হয়। অনুরূপভাবে রাসায়নিক বিক্রিয়া সংঘটিত হওয়ার জন্য তাপের শোষণ হতে পারে। এক্ষেত্রে কখনো কখনো রাসায়নিক বিক্রিয়া সংঘটিত করার জন্য ব্যবহৃত পাত্রের গায়ে হাত দিলে ঠাণ্ডা অনুভূত হয়। আবার কখনো বাহির থেকে তাপ দেওয়া ছাড়া বিক্রিয়াই হয় না। যেমন: খাবার সোডা ও লেবুর রস বা ভিনেগারের বিক্রিয়ার সময় তাপের শোষণ ঘটে। খাবার সোডা হলো- সোডিয়াম-বাই-কাবর্নেট (NaHCO3)। অপরদিকে লেবুর রসে সাইট্রিক এসিড ও ভিনেগারে এসিটিক এসিড থাকে। সোডিয়াম-বাই-কাবর্নেট এসিডের সাথে বিক্রিয়ায় কার্বন-ডাই -অক্সাইড, লবণ ও পানি উৎপন্ন করে। বিক্রিয়াটি সংঘটিত হওয়ার সময় দ্রবণ থেকে তাপ শোষণ করে, ফলে আমরা দ্রবণটি ঠাণ্ডা হতে দেখি। NaHCO3(aq)+ CH3COOH(aq) + তাপ (দ্রবণ থেকে শোষিত)→CH3COO-Na+ + CO2(g) + H2O
অথবা
NaHCO3(aq)+ H+(aq) (সাইট্রিক এসিড) + তাপ (দ্রবণ থেকে শোষিত)→Na+- লবণ (সোডিয়াম সাইট্রেট) (aq) + CO2(g) + H2O (l)
চিত্র-৮.১: তাপ-উৎপাদী বিক্রিয়া। তাপ রাসায়নিক পদার্থ রাসায়নিক পদার্থ চিত্র-৮.২:তাপহারী বিক্রিয়া। তাপ
রসায়ন ১১৩

সালফার ও নাইট্রোজেন মৌলযুক্ত যৌগ থাকে, তাহলে জ্বালানি পোড়ানোর সময় পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ সালফার ও নাইট্রোজেনের বিভিন্ন অক্সাইড উৎপন্ন হয়। সালফার-ডাই-অক্সাইড বায়ুর জলীয়বাষ্পের সাথে যুক্ত হয়ে সালফিউরিক এসিড তৈরি করে, যা এসিডবৃষ্টির (acid rain) সৃষ্টি করে। আমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারি যে, এসিডবৃষ্টি পরিবেশের গাছপালা ও জীবজন্তুর টিকে থাকার জন্য অন্তরায়। এছাড়াও যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়ায় কার্বন -মনো -অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড ও অব্যবহৃত গ্যাসীয় জ্বালানি (মিথেন) বায়ুতে মিশে সূর্যের আলোর উপস্থিতিতে নানা রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন বিষাক্ত গ্যাসের ধোঁয়ার সৃষ্টি করে। একে ‘ফটোক্যামিক্যাল ধোঁয়া’ (photochemical smog) বলে। ফটোক্যামিক্যাল ধোঁয়ার উপাদান গ্যাসসমূহ বায়ুমণ্ডলের ওজোন (O3) স্তরের মারাত্মক ক্ষয়সাধন করে। অতএব স্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষায় বিশুদ্ধ জ্বালানির ব্যবহার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

৮.৬ রাসায়নিক শক্তি ব্যবহারের নেতিবাচক প্রভাব
আমরা উপরে দেখলাম যে, রাসায়নিক শক্তির ব্যবহার উপযোগী করার মূলনীতি মূলত জ্বালানিকে বায়ুর সাথে পুড়িয়ে (জারণ বিক্রিয়া) তাপ উৎপন্ন করা। যদিও ফুয়েল সেল ও অন্যান্য ক্ষেত্রে বিশেষ করে বিভিন্ন তড়িৎ রাসায়নিক কোষ ও নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ায় রাসায়নিক শক্তি থেকে ব্যবহারযোগ্য শক্তির উৎপাদনের মূলনীতি ভিন্ন। প্রকৃতপক্ষে, সিংহভাগ শক্তিই জ্বালানিকে পুড়িয়েই উৎপাদন করা হয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে হাজার হাজার টন জ্বালানি পোড়ানোর ফলে উদ্ভূত সমতুল্য পরিমাণ CO2 গ্যাস ও অন্যান্য গ্যাসসমূহ বিশেষ করে CO, SO2, NO ও ধোঁয়ার সাথে বের হওয়া অদহনীয় জ্বালানি কোথায় যাচ্ছে? নিশ্চয়ই এরা বাতাসের সাথে মিশে যাচ্ছে। উলেখ্য যে, সালোকসংশ্লেষণ বিক্রিয়ায় বায়ুতে মিশে যাওয়া CO2 গ্যাস ব্যবহৃত হয় বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে একদিকে আমরা উদ্ভিদকুলের নিধন করছি, অন্যদিকে আমাদের অত্যাধুনিক জীবনব্যবস্থার চাহিদা মেটানোর জন্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি করছি। এতে করে দিনে দিনে বায়ুমণ্ডলে CO2 -এ র পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। যদিও CO2 বায়ুর অন্য উপাদানের সাথে বিক্রিয়া করে না, তবে CO2 গ্যাসের তাপ ধারণক্ষমতা বেশি, অর্থাৎ CO2 তাপ শোষণ করে তা ধরে রাখতে পারে (trapping of heat) । আবার CO2 গ্যাস ওজনে ভারী হওয়ায় পৃথিবীপৃষ্ঠের কাছাকাছি অবস্থান করে। এতে করে দিনে দিনে পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে, যাকে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন (global worming) বলা হয়। CO2 গ্যাসের এ ধরনের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ঘটনা ‘গ্রিন হাউজ প্রভাব’ (greenhouse effect) বলে পরিচিত এবং CO2 -কে গ্রিনহাউজ গ্যাস বলা হয়। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে মেরুঅঞ্চলের বরফ গলে পানিতে পরিণত হয়ে অনাকাক্সিক্ষত বন্যার সৃষ্টি করছে (চিত্র -৮.৮)। অন্যদিকে, জ্বালানি পোড়ানোর ফলে উদ্ভূত অন্যান্য গ্যাসসমূহ নানারকম রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে বায়ুকে দূষিত করছে এবং বায়ুতে বিভিন্ন উপাদানের ভারসাম্য নষ্ট করে এসিডবৃষ্টি ও ফটোক্যামিক্যাল ধোঁয়ার সৃষ্টি করছে। তাছাড়াও এসব গ্যাস ওজোনস্তরের সাথে সরাসরি বিক্রিয়া করে এর পুরুত্ব কমিয়ে দিচ্ছে বা ওজোনস্তরে ক্ষতের (hole) সৃষ্টি করছে। আসলে ওজোনস্তর সূর্যের আলোর ছাঁকনি হিসেবে কাজ করে সূর্যের আলোতে উপস্থিত অতিবেগুনি রশ্মি (ultraviolet ray) পৃথিবীতে আসতে বাধা প্রদান করে। পরবর্তী শ্রেণিতে আমরা এদের প্রভাবে কী কী হতে পারে তার বিস্তারিত জানব।

১১৪ রসায়ন

চিত্র-৮.৮: কারখানা থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের নিঃসরণ (বামে) ও বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে পানি হচ্ছে (ডানে)।

৮.৭ ইথানলকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার
ইথানল, যার অপর নাম ইথাইল অ্যালকোহল- এটি একটি দাহ্য তরল রাসায়নিক পদার্থ। খনিজ জ্বালানি যেমন- কেরোসিন, পেট্রোল, ডিজেল প্রভৃতির মতো ইথানলকে পোড়ালে তাপ উৎপন্ন হয়। তাহলে খনিজ জ্বালানির মতো ইথানলকে তাপ ইঞ্জিনের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে কলকারখানা, গাড়ি, বিমান, জাহাজ প্রভৃতি চালানো যেতে পারে। ব্রাজিল, উত্তর আমেরিকাসহ উন্নত দেশসমূহে ইথানলকে পেট্রোলিয়াম (খনিজ জ্বালানি) -এর সাথে মিশ্রিত করে তাপ ইঞ্জিনে ব্যবহার করা হয়। আমেরিকার মোটামুটি সব কারগাড়ি পেট্রোলের সাথে শতকরা ১০ ভাগ ইথানলমিশ্রিত জ্বালানি ব্যবহার করে রাস্তায় চলাচল করছে। ব্রাজিলের সরকার খনিজ জ্বালানির সাথে শতকরা ২৫ ভাগ ইথালন মিশ্রিত করে ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক করেছে। এছাড়াও আধুনিককালের ও পরবর্তী প্রজন্মের ব্যবহারযোগ্য শক্তি উৎপাদনের প্রযুক্তি বলে খ্যাত ‘ফুয়েল সেল’ (fuel cell)-এর জ্বালানি হিসেবে অ্যালকোহল (মিথানল ও ইথানল) ব্যবহৃত হচ্ছে। নিশ্চয়ই এই প্রশ্নটা মনে জাগতে পারে, এত সব জ্বালানি থাকতে ইথানলের ব্যবহার দরকার কেন? বলা হচ্ছে যে, খনিজ জ্বালানির মজুদ একসময় শেষ হয়ে যাবে। তাহলে চিন্তা করা প্রয়োজন আমরা কীভাবে শক্তির উৎপাদন করব, কীভাবে যানবাহন বা কলকারখানা চালাব? এমতাবস্থায় যদি ইথালনকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে অবশ্যই খনিজ জ্বালানির মজুদের উপর চাপ কম পড়বে। মজার ব্যাপার হলোঃ ইথানল হলো একটি জৈব রাসায়নিক যৌগ, যা শ্বেতসার জাতীয় শস্য দানা যেমনঃ আলু, ভুট্টা, ইক্ষু প্রভৃতি থেকে গাজন প্রক্রিয়ার (fermentation reaction) মাধ্যমে উৎপন্ন করা যায়। এজন্য ইথানলকে জৈব জ্বালানি (bio-fuel) বলা হয়। অধুনা নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে সেলুলোজ (উদ্ভিদের দেহের উপাদান) থেকে ইথানল উৎপাদন করাও সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে, কৃষিকাজের মাধ্যমে শস্য ও উদ্ভিদ তথা ইথানলের নিয়মিতভাবে উৎপাদন নিশ্চিত করা সম্ভব। অতএব খনিজ জ্বালানির মতো ইথানল ফুরাবার ভয় নেই। তাহলে, ইথানলের বাণিজ্যিক উৎপাদন ও বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের প্রযুক্তি উদ্ভাবন একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।

৮.৮ তড়িৎ রাসায়নিক কোষ (Electrochemical cell)
উপরে আমরা জানলাম যে, জ্বালানিকে পুড়িয়ে রাসায়নিক শক্তিকে তাপশক্তিতে পরিণত করে বিভিন্নভাবে কাজে লাগানো যায়। এখানে আমরা শিখব কীভাবে রাসায়নিক শক্তিকে তাপশক্তিতে রূপান্তরিত না করে সরাসরি বিদ্যুৎশক্তিতে পরিণত করা যায় ও পাশাপাশি কীভাবে বিদ্যুৎশক্তিকে ব্যবহার করে রাসায়নিক বিক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়। গ্যালভানি (Luigi

রসায়ন ১১৫

Galvani) ও ভোলটা (Alessandro Volta) প্রথম রাসায়নিক শক্তিকে বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তরিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। গ্যালভানি ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে ও ভোলটা ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে আলাদাভাবে পরীক্ষার মাধ্যমে বুঝতে পারেন যে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটা জারণ-বিজারণ বিক্রিয়ার (redox reaction) মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা সম্ভব। মূলত তাদের আবিষ্কারের ফলেই আজ আমরা ব্যাটারি পেয়েছি। তাহলে, গ্যালভানিক কোষ (Galvanic cell) (যা ভোলটায়িক কোষ (Voltaic cell) বলেও পরিচিত) হলো এক ধরনের তড়িৎ রাসায়নিক কোষ (Electrochemical cell) যার মাধ্যমে রাসায়নিক শক্তি থেকে বিদ্যুৎশক্তি তৈরি করা যায়। অপরদিকে বিদ্যুৎশক্তি ব্যবহার করে তড়িৎ রাসায়নিক কোষের মাধ্যমে রাসায়নিক বিক্রিয়া সংঘটিত করা যায়। একে তড়িৎ বিশ্লেষণ (electrolysis) বলা হয়। যে কোষে তড়িৎ বিশ্লেষণ করা হয় তাকে তড়িৎ বিশ্লেষ্য কোষ (electrolytic cell) বলে। তড়িৎ রাসায়নিক কোষ বিভিন্ন ক্ষুদ্রাংশ, যেমন তড়িৎদ্বার (electrode), লবণ- সেতু (salt bridge) ও তড়িৎ বিশ্লেষ্য দ্রবণ নিয়ে গঠিত। নিম্নে তড়িৎ রাসায়নিক কোষের বিভিন্ন বিষয়ের আলোচনা করা হলো।

৮.৯ বিদ্যুৎ পরিবাহী ও তড়িৎদ্বার
পরিবাহী: যে সকল পদার্থের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হতে পারে, তাদেরকে বিদ্যুৎ পরিবাহী (conductor) বলে। আর যাদের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হতে পারে না, তাদেরকে অপরিবাহী (insulator) বলে। ধাতু, কার্বন, গ্রাফাইট, গলিত লবণ ও এসিড, ক্ষার ও লবণের দ্রবণ প্রভৃতি বিদ্যুৎ পরিবাহী হিসেবে কাজ করে। বিদ্যুৎ পরিবহনের কৌশলের (mechanism) উপর ভিত্তি করে পরিবাহীকে দুইভাগে ভাগ করা যায়। যথা:- (১) ইলেকট্রনিক (electronic) ও (২) তড়িৎ বিশ্লেষ্য (electrolytic) পরিবাহী। যে সকল পরিবাহী ইলেকট্রন প্রবাহের মাধ্যমে বিদ্যুৎ প্রবাহিত করে তাকে ইলেকট্রনিক পরিবাহী বলে। যেমনঃ- সকল ধাতু ও গ্রাফাইট। বিদ্যুৎপ্রবাহ যদি পরিবাহীর আয়ন দ্বারা সাধিত হয়, ঐসব পরিবাহীকে তড়িৎ বিশ্লেষ্য পরিবাহী বলে। যেমনঃ-গলিত লবণ, এসিড, ক্ষার ও লবণের দ্রবণ।

তড়িৎদ্বার: তড়িৎদ্বার হলো ধাতব বা অধাতব বিদ্যুৎ পরিবাহী পদার্থ। এদেরকে ইলেকট্রনিক পরিবাহী বলা হয়। তড়িৎদ্বার তড়িৎ রাসায়নিক কোষের ইলেকট্রনিক পরিবাহী ও দ্রবণের (আয়নিক পরিবাহী) মধ্যে বিদ্যুৎ প্রবাহের যোগসূত্র রক্ষা করে। তড়িৎ রাসায়নিক কোষ গঠনে দুটি তড়িৎদ্বার প্রয়োজন। একটিকে অ্যানোড তড়িৎদ্বার এবং অপরটিকে ক্যাথোড তড়িৎদ্বার বলে।
অ্যানোড তড়িৎদ্বারেঃ- ১. জারণ বিক্রিয়া সম্পন্ন হয় ২. দ্রবণের অ্যানায়নের ইলেকট্রন ধাতব দণ্ডে (অ্যানোড) স্থানান্তরিত হয়। ক্যাথোড তড়িৎদ্বারেঃ- ১. বিজারণ বিক্রিয়া সম্পন্ন হয় ২. দ্রবণের ক্যাটায়ন কর্তৃক ধাতব দণ্ড (ক্যাথোড) থেকে ইলেকট্রন গ্রহণ করে। তড়িৎ বিশ্লেষ্য কোষে অ্যানোড ও ক্যাথোড তড়িৎদ্বার হিসেবে ধাতব দণ্ড বা গ্রাফাইট দণ্ড ব্যবহার করা হয়। এই কোষে অ্যানোড ও ক্যাথোড তড়িৎদ্বার হিসেবে একই ধাতব দণ্ড অথবা ভিন্ন ধাতব দণ্ড ব্যবহার করা যায়। ধাতব দণ্ড শুধুমাত্র ইলেকট্রন পরিবাহীর কাজ করে, কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে না। তড়িৎবিশে -ষ্য কোষে ব্যবহৃত ব্যাটারির ধনাত্মক প্রান্ত যে ধাতব দণ্ডের সাথে যুক্ত তা অ্যানোড হিসেবে এবং ঋণাত্মক প্রান্ত যে ধাতব দণ্ডের সাথে যুক্ত তা ক্যাথোড হিসেবে কাজ করে। গ্যালভানিক কোষে অ্যানোড ও ক্যাথোড তড়িৎদ্বার গঠনের পদ্ধতি তড়িৎ বিশ্লেষ্য কোষ থেকে পৃথক। একটি ধাতব

১১৬ রসায়ন

দণ্ডকে ঐ ধাতুর তড়িৎ বিশ্লেষ্য দ্রবণের মধ্যে স্থাপন করে তড়িৎদ্বার গঠন করা হয়। গ্যালভানিক কোষের অ্যানোড ও ক্যাথোড হিসেবে ভিন্ন ধাতব দণ্ডকে ব্যবহার করা হয় (একই ধাতব দণ্ডকে ভিন্ন ঘনমাত্রার তড়িৎ বিশ্লেষ্যের মধ্যে স্থাপন করে অ্যানোড ও ক্যাথোড গঠন করা যায়। এই সম্পর্কে পরবর্তী শ্রেণিতে জানবে)। গ্যালভানিক কোষের অ্যানোড ও ক্যাথোড নির্ধারিত হয় ধাতুর সক্রিয়তা দ্বারা। তড়িৎদ্বার হিসেবে ব্যবহৃত ধাতব দণ্ডদ্বয়ের মধ্যে অধিক সক্রিয় ধাতু অ্যানোড এবং কম সক্রিয় ধাতু ক্যাথোড হিসেবে কাজ করে।

ধাতু/ধাতব আয়ন তড়িৎদ্বার
বিভিন্ন প্রকারের তড়িৎদ্বার রয়েছে। তন্মধ্যে ধাতু/ধাতব আয়ন তড়িৎদ্বার অন্যতম। কোনো একটি ধাতু যদি উক্ত ধাতুর লবণের দ্রবণে ডুবানো থাকে, তাহলে তাকে ধাতু/ধাতু আয়ন তড়িৎদ্বার বলেঃ যেমন: কপার ধাতুর দণ্ড বা ধাতব পাত কপার সালফেটের জলীয় দ্রবণে ডুবানো থাকে, তাহলে তাকে কপার/কপার(II) বা Cu|Cu2+(aq) তড়িৎদ্বার বলে। অনুরূপভাবে, Ag|Ag+(aq) এবং Zn|Zn2+উল্লেখযোগ্য ধাতু/ধাতব আয়ন তড়িৎদ্বারের উদাহরণ।

তড়িৎদ্বার বিক্রিয়া
উপরে আমরা ধাতু/ধাতব আয়ন তড়িৎদ্বার সম্পর্কে জেনেছি। Ag|Ag+ তড়িৎদ্বারটির বিক্রিয়াকে আমরা নিম্নোক্তভাবে লিখতে পারি।
Ag(s)→ Ag++ e-
Ag++ e-→Ag(s)
ধাতু/ধাতব আয়ন তড়িৎদ্বার বিক্রিয়া উভমুখী প্রকৃতির হয়ে থাকে। অর্থাৎ তড়িৎদ্বার বিক্রিয়ায় ধাতব অম (ং) ইলেকট্রন ত্যাগ করে অম+(ধয়) আয়নে পরিণত হয়ে দ্রবণে দ্রবীভূত হয়। অন্যথায় দ্রবণের অম+ (ধয়) আয়নকে যদি একটি ইলেকট্রন প্রদান করা যায়, তাহলে অম+ (ধয়) আয়ন ধাতব অম(ং) এ পরিণত হবে। তাহলে তড়িৎদ্বার বিক্রিয়া জারণ বা বিজারণ বিক্রিয়া। অর্থাৎ কোনো একটি তড়িৎদ্বার বিক্রিয়ায় ইলেকট্রনের আদান অথবা প্রদান ঘটে। কিন্তু আমরা জানি, জারণ -বিজারণ যুগপৎ ঘ টে। যদি একটি তড়িৎদ্বার ইলেকট্রন প্রদান করে (জারণ) তাহলে উক্ত ইলেকট্রনটি গ্রহণ করার জন্য আরেকটি তড়িৎদ্বারের প্রয়োজন নয় কি? আসলে ঠিক তাই। তড়িৎ রাসায়নিক বিক্রিয়ায় জন্য দুইটি তড়িৎদ্বার থাকে - ক ্যাথোড ও অ্যানোড। তড়িৎ রাসায়নিক বিক্রিয়ায় যে তড়িৎদ্বার তড়িৎ বিশে-ষ্য পদার্থকে ইলেকট্রন প্রদান করে, তাকে ক্যাথোড বলে। আবার যে তড়িৎদ্বার তড়িৎ বিশে -ষ্য পদার্থ থেকে ইলেকট্রন গ্রহণ করে তাকে অ্যানোড বলে। তড়িৎদ্বার বিক্রিয়া স্বতঃস্ফূর্ত হতে পারে। অন্যথায় তড়িৎদ্বারে বিদ্যুৎ প্রবাহের মাধ্যমে তড়িৎদ্বার বিক্রিয়া সম্পাদন করা যায়। অ্যানোড বিক্রিয়া : গ → গ+ + ব¯ ক্যাথোড বিক্রিয়া : ঢ + ব¯→ ঢ¯

৮.১০ গ্যালভানিক কোষ
যে তড়িৎ রাসায়নিক কোষে তড়িৎদ্বার বিক্রিয়া স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটে, অর্থাৎ বিক্রিয়া সংঘটনের জন্য বাহির থেকে শক্তির দরকার হয় না এবং রাসায়নিক শক্তি বিদ্যুৎশক্তিতে পরিণত হয়, তাকে গ্যালভানিক কোষ বলে। ড্যানিয়াল কোষ (Daniel cell) একটি গ্যালভানিক কোষ ড্যানিয়াল কোষ ক্যাথোড হিসেবে ঈঁ।ঈঁ২+(ধয়) ধাতু/ধাতব আয়ন তড়িৎদ্বার ও অ্যানোড হিসেবে তহ।তহ২+(ধয়) ধাতু/ধাতব আয়ন তড়িৎদ্বার নিয়ে গঠিত। চিত্রে ৮.৯ -এ ড ্যানিয়াল কোষের গঠন দেখানো হলো। ক্যাথোড হিসেবে একটি পাত্রে কপার দণ্ড কপার সালফেটের জলীয় দ্রবণে ডুবানো থাকে।

রসায়ন ১১৭

ক+ ঈষ¯ ব¯ ব¯ তহঝঙ৪ দ্রবণ ঈঁঝঙ৪ দ্রবণ লবণ সেতু (salt bridge) কপার (ঈঁ) ক্যাথোড জিংক (তহ) অ্যানোড চিত্র-৮.৯: গ্যালাভানিক কোষ।
তহ(ং) + ঈঁ২+ (ধয়) → তহ২+(ধয়) + ঈঁ (ং) অন্য পাত্রে অ্যানোড হিসেবে জিংক দন্ড জিংক সালফেটের জলীয় দ্রবণে ডুবানো থাকে। পাত্রদ্বয়ের দ্রবণের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের জন্য নিষ্ক্রিয় তড়িৎ বিশ্লেষ্য (কঈষ) দ্রবণপূর্ণ U-আকৃতির টিউব দ্রবণদ্বয়ের মধ্যে ডুবানো হয়। এবার যদি তারের সাহায্যে তড়িৎদ্বার দুটিকে সংযুক্ত করা হয়, তাহলে নিম্নোক্ত জারণ -বিজারণ বিি ক্রয়া স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটবে। অ্যানোড বিক্রিয়া : তহ (ং) → তহ২+ (ধয়) + ২ব¯ ক্যাথোড বিক্রিয়া : ঈঁ২+ (ধয়) + ২ব¯→ ঈঁ (ং) অর্থাৎ তহ অ্যানোড নিজে ইলেকট্রন ছেড়ে বিযোজিত (ফরংংড়ষঁঃরড়হ) হয়ে দ্রবণে তহ২+(ধয়) আয়ন হিসেবে দ্রবীভূত হবে। অপরদিকে, দ্রবণ হতে ঈঁ২+(ধয়) আয়ন ক্যাথোড থেকে ইলেকট্রন গ্রহণ করে ধাতব ঈঁ হিসেবে ক্যাথোড জমা হবে। প্রকৃতপক্ষে, অ্যানোডে উৎপন্ন ইলেকট্রন তারের মাধ্যমে ক্যাথোডে পৌঁছে ইলেকট্রনের সমতা রক্ষা করে। তাহলে তার দিয়ে তড়িৎদ্বার দুটিকে সংযুক্ত করলেই অ্যানোড থেকে ক্যাথোডে ইলেকট্রন প্রবাহের সৃষ্টি হবে। ইলেকট্রন প্রবাহ মানেই বিদ্যুৎপ্রবাহ। তাহলে আমরা বুঝলাম, যদি ড্যানিয়াল কোষের বাইরের তারের সাথে বৈদ্যুতিক বাল্ব যুক্ত করা হয়, তাহলে বাল্বটি জ্বলে উঠবে। এবার ভেবে দেখ, উলে-খিত বিদ্যুৎপ্রবাহ কতক্ষণ চলবে? তাছাড়াও কোষ বিক্রিয়া শেষে ভরের দিক থেকে জিংক ও কপার দণ্ডের অবস্থা কী হবে? নিজেরা চিন্তা করে বের কর ও খাতায় লেখ। চল এবার লবণ - সেতুর কার্য ও প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করি। আমরা দেখলাম যে, অ্যানোডে তহ২+(ধয়) আয়ন তৈরি হয়ে দ্রবণে যায়। অপরদিকে, ক্যাথোডে দ্রবণ থেকে ঈঁ২+(ধয়) আয়ন ঈঁ হিসেবে জমা হয়। তাহলে, অ্যানোড পাত্রে তহ২+(ধয়) আয়নের আধিক্য হয় ও ক্যাথোড পাত্রে ঈঁ২+(ধয়) আয়নের ঘাটতি হয়। আমরা জানি যে, কোনো একটি বিশেষ আয়ন (ধনাত্মক বা ঋণাত্মক) একা থাকতে পারে না। অর্থাৎ একটি ধনাত্মক আয়ন একটি ঋণাত্মক আয়নের উপস্থিতি ছাড়া তৈরি হয় না। উল্টোটিও ঠিক। সুতরাং অ্যানোড পাত্রে উৎপন্ন তহ২+(ধয়) আয়নের সমতুল্য পরিমাণ ঋণাত্মক আয়নের (সালফেট আয়ন) প্রয়োজন হবে। অ


Share your opinion