রাসায়নিক বিক্রিয়া

From Notun boi
Jump to: navigation, search

Template:Toc jsc agriculture


আমাদের চারপাশে নানা রকমের রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে যাচ্ছে। এই সমস্ত রাসায়নিক বিক্রিয়া কখনও শক্তি উৎপন্ন করে, কখনও ব্যবহার উপযোগী নতুন পদার্থ তৈরি করে আবার কখনওবা রোগ নিরাময়েও সাহায্য করে।

Aa45.jpg

এই অধ্যায় পাঠ শেষে আমরা

  • বিভিন্ন প্রকার রাসায়নিক বিক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে পারব।
  • রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকারের শক্তির রূপ ান্তর ব্যাখ্যা করতে পারব।
  • শুষ্ক কোষের শক্তির রূপান্তর ব্যাখ্যা করতে পারব।
  • তড়িৎ বিশ্লেষণ ব্যাখ্যা করতে পারব।
  • আমাদের জীবনে রাসায়নিক বিক্রিয়ার অবদান উপলব্ধি করতে পারব।
  • পরীক্ষণ কাজে রাসায়নিক পদার্থ এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতির ব্যবহার সঠিকভাবে করতে পারব।

পাঠ ১ : রাসায়নিক বিক্রিয়া ; সংযোজন (Addition)
কাজ : সংযোজন বিক্রিয়া বুঝা।
প্রয়োজনীয় উপকরণ : টেষ্টটিউব, মর্টার, স্পিরিট ল্যাম্প বা বার্নার, লোহার গুঁড়া, সালফার, নিক্তি।
পদ্ধতি : টেষ্টটিউবটি ভালো করে ধুয়ে শুকিয়ে নাও। ৭ গ্রাম লোহার গুঁড়া ও ৪ গ্রাম সালফার (সমানুপাতিক হারে ভিন্ন পরিমাণও নেওয়া যায়) নিক্তি দিয়ে মেপে মর্টারে নাও ও খুব ভালোভাবে পিষে নাও এবং তারপর শুকনা টেষ্টটিউবে ঢেলে দাও। এবার স্পিরিট ল্যাম্প বা বার্নার দিয়ে টেষ্টটিউবের তলায় তাপ দিতে থাক। তাপ দেওয়ার সময় খেয়াল রাখ যেন আগুনের শিখা ছোট হয়। তাপ দিতে দিতে টেষ্টটিউবের মিশ্রণটি যখন রক্তিমাভার মতো হবে তখন তাপ দেওয়া বন্ধ কর। টেষ্টটিউবটি মর্টারের উপরে ধরে রাখ যেন এটি ভেঙ্গে গেলেও টেষ্টটিউবের ভিতরের বস্তু নষ্ট না হয়ে যায়। অতঃপর টেষ্টটিউবটি ঠান্ডা কর ও ভেঙ্গে ভিতরের বস্তুটিকে আলাদা কর।
টেষ্টটিউব থেকে যে বস্তুটি পেলে তা দেখতে গাঢ় ধূসর বর্ণের। তোমরা এতে হালকা হলুদ রঙের সালফার বা লোহার গুঁড়া কোনোটিই দেখতে পাচ্ছ না, কারণ এখানে লোহা ও সালফার একে অপরের সাথে মিলে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী নতুন পদার্থ আয়রন সালফাইড তৈরি করেছে।

Aa46.jpg

এই ধরনের রাসায়নিক পরিবর্তন যেখানে একের অধিক পদার্থ একত্রিত হয়ে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী নতুন একটি রাসায়নিক পদার্থ তৈরি করে তাকে সংযোজন বিক্রিয়া বলে। একইভাবে জিংক (Zn) ও (S) সালফারের বিক্রিয়ায় জিংক সালফাইড (ZnS) তৈরির বিক্রিয়াও সংযোজন বিক্রিয়া।

Aa47.jpg

এখানে উল্লিখিত দুটি বিক্রিয়াকেই মৌল থেকে যৌগ তৈরির সংযোজন বিক্রিয়া দেখানো হয়েছে। তবে দুটি যৌগ যুক্ত হয়েও কিন্তু সংযোজন বিক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন আরেকটি যৌগ তৈরি হতে পারে। যেমন- ক্যালসিয়াম অক্সাইড (CaO) ও কার্বন ডাইঅক্সাইডের ($ CO_{2} $) মধ্যে সংযোজন বিক্রিয়ার মাধ্যমে ক্যালসিয়াম কার্বোনেট ($ CaCO_{3} $) তৈরি হয়।

Aa48.jpg

পাঠ ২ ও ৩ : দহন বিক্রিয়া ( Combustion reaction)
কাজ : সালফার ও অক্সিজেনের দহন বিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ।
প্রয়োজনীয় উপকরণ : একটি লম্বা হাতলযুক্ত দহন চামচ, কিছু সালফার, স্পিরিট ল্যাম্প বা বার্নার।
পদ্ধতি : তোমরা দহন চামচে কিছুটা সালফার নাও। স্পিরিট ল্যাম্প বা বার্নার দিয়ে চামচটিতে তাপ দিতে থাক। তোমরা কী দেখতে পাচ্ছ?
প্রথমে সালফার গলে গেল তারপর তোমরা নীল আগুনের শিখা দেখতে পাচ্ছ এবং একটি ঝাঁঝালো গন্ধ পেয়েছ তোমরা। কারণ হলো তাপ দেওয়ার ফলে সালফার বাতাসের অক্সিজেনের সাহায্যে দহন বিক্রিয়ার মাধ্যমে সালফার ডাইঅক্সাইড (ঝঙ২) গ্যাস তৈরি করেছে যার জন্য তোমরা ঝাঁঝালো গন্ধ পেয়েছ।

Aa49.jpg

কাজ : ম্যাগনেশিয়াম ও অক্সিজেনের দহন বিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ।
প্রয়োজনীয় উপকরণ : ম্যাগনেশিয়াম রিবন, চিমটা আংটা, (লাইটার) স্পিরিট ল্যাম্প/ বুনসেন বার্নার। পদ্ধতি : ম্যাগনেশিয়াম রিবনের একটি ছোট টুকরার (৮ সেন্টিমিটার) একমাথা চিমটা দিয়ে ধর। চোখে নিরাপত্তা চশমা পরে নাও। রিবনের অন্য মাথাটি বুনসেন বার্নারের শিখার উপর ধর। লাইটার দিয়েও এটি করা যায়। খুব ভালোভাবে লক্ষ কর কী ঘটছে?
রিবনে আগুন ধরে গেল এবং অত্যন্ত প্রজ্বলিত শিখাসহ জ্বলতে লাগল। এর কারণ হলো ম্যাগনেসিয়াম বাতাসের অক্সিজেনে দহন বিক্রিয়ার মাধ্যমে পুড়তে থাকে আর আমরা প্রজ্বলিত শিখা দেখতে পাই। এভাবে যখন সমস্ত ম্যাগনেসিয়াম পুড়ে শেষ হয়ে যায়, তখন আপনাআপনি শিখা নিভে যায়। শেষে তোমরা ছাই এর মতো কিছু দেখতে পাচ্ছ কি? এটি আসলে ম্যাগনেসিয়াম ও অক্সিজেন পুড়ে তৈরি হওয়া ম্যাগনেসিয়াম অক্সাইড।

Aa50.jpg

কাজ : মোমের দহন প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানা।
প্রয়োজনীয় উপকরণ : মোমবাতি, দিয়াশলাই।
পদ্ধতি : দিয়াশলাই দিয়ে মোমবাতি জ্বালাও। খুব ভালোভাবে খেয়াল কর কী ঘটছে? সময়ের সাথে সাথে মোমবাতির আকার ছোট হয়ে যাচ্ছে। বল তো এর কারণ কী? মোমবাতি জ্বালানোর ফলে উৎপন্ন তাপে মোম গলে যাচ্ছে। এই গলিত মোমের ছোট একটি অংশ ঠান্ডা হয়ে মোমের গা বেয়ে নিচে পড়ছে কিন্তু বেশিরভাগ অংশই সলতের মধ্য দিয়ে উপরে উঠে উৎপন্ন তাপে বাষ্পীভূত হচ্ছে। এই বাষ্পীভূত মোম দহন বিক্রিয়ার মাধ্যমে বায়ুর অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করছে। এর ফলে তাপ ও আলোকশক্তি উৎপন্ন হচ্ছে।
পাঠ ৪-৭ : প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া ( Substitution or displacement reaction)
কাজ : লোহা ও তুঁতের বিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ।
প্রয়োজনীয় উপকরণ : লোহার গুঁড়া, তুঁতে, পানি ও টেষ্টটিউব
পদ্ধতি : টেষ্টটিউবের চার ভাগের এক ভাগ পানি নাও। কিছু তুঁতে যোগ করে ভালোভাবে ঝাঁকিয়ে তুঁতের দ্রবণ তৈরি কর। এবার তুঁতের নীল দ্রবণে কিছু লোহার গুঁড়া যোগ করে ভালোভাবে ঝাঁকাও। কোনো পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছ কি? দ্রবণের নীল রং আস্তে আস্তে হালকা সবুজ হয়ে যাচ্ছে আর তামার ছোট ছোট কণা টেষ্টটিউবের তলায় জমতে শুরু করেছে। নীল দ্রবণ কেন হালকা সবুজ হলো?
এখানে লোহার গুঁড়া ও তুঁতের মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়া সংঘটিত হয়েছে। ফলে আয়রন সালফেট ($ FeSO_{4} $) ও কপার তৈরি হয়েছে। উৎপন্ন আয়রন সালফেটের রং হালকা সবুজ বলেই দ্রবণের রং নীল থেকে হালকা সবুজ হলো।

Aa51.jpg

এখানে লোহা, তুঁতে বা কপার সালফেট থেকে কপারকে সরিয়ে নিজে ঐ স্থান দখল করে আয়রন সালফেট তৈরি করেছে।
এই সকল বিক্রিয়া যেখানে একটি মৌল কোনো যৌগ থেকে অপর একটি মৌলকে সরিয়ে নিজে ঐ স্থান দখল করে নতুন যৌগ তৈরি করে তাকে প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া বলে।
তোমরা এখন তুঁতের দ্রবণে জিংক বা দস্তা (Zn), ম্যাগনেসিয়াম (Mg) ইত্যাদি যোগ করে দেখ কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে।
বিয়োজন বিক্রিয়া (Decomposition reaction):
কাজ : চুনা পাথরের বিয়োজন বিক্রিয়া দেখা।
প্রয়োজনীয় উপকরণ : চুনা পাথর ($ CaCO_{3} $), স্পেচুলা বা চামচ, ২টি টেষ্টটিউব, চুনের পানি, নির্গমন নল, বুনসেন বার্নার বা স্পিরিট ল্যাম্প। কাম্প, ষ্ট্যান্ড, কর্ক ও হাতমোজা।
পদ্ধতি : হাতমোজা পরে স্পেচুলা দিয়ে ৫ গ্রাম চুনাপাথর টেষ্টটিউবে নাও। অপর টেষ্টটিউবে ১-২ মিলিলিটার চুনের পানি নিয়ে চিত্রের মতো করে লাগাও। এবার স্পিরিট ল্যাম্প বা বুনসেন বার্নার দিয়ে তাপ দিতে থাক। খুব ভালোভাবে খেয়াল কর কী ঘটছে। যে টেষ্টটিউবে চুনের পানি নিয়েছ সেখানে কোনো পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছ কি?

Aa52.jpg

হ্যাঁ, চুনের পানি ঘোলা হয়ে যাচ্ছে। এর কারণ হলো প্রথম টেষ্টটিউবে নেওয়া চুনাপাথর তাপ দেওয়ার ফলে বিয়োজিত হয়ে বা ভেঙ্গে কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাস ও ক্যালসিয়াম অক্সাইড উৎপন্ন করেছে। উৎপন্ন কার্বন ডাইঅক্সাইড ২য় টেষ্টটিউবে (নির্গমন নলের মাধ্যমে) যাওয়ার ফলে সেখানে চুনের পানি ও কার্বন ডাইঅক্সাইড বিক্রিয়া করে আবার ক্যালসিয়াম কার্বোনেট তৈরি হওয়ায় চুনের পানি ঘোলা হয়ে যাচ্ছে।

Aa53.jpg

তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, এখানে তাপ প্রয়োগের ফলে চুনাপাথর ভেঙ্গে গিয়ে দুটি নতুন যৌগ উৎপন্ন করেছে। এই বিক্রিয়ার মতো যে সকল বিক্রিয়ায় একটি যৌগ ভেঙ্গে একাধিক যৌগ উৎপন্ন হয় তাদেরকে বিয়োজন বিক্রিয়া বলে।
চুনাপাথরের ন্যায় কপার কার্বনেটকে ($ CuCO_{3} $) তাপ দিলে তা ভেঙ্গে কপার অক্সাইড ও কার্বন ডাইঅক্সাইড উৎপন্ন হয়।

Aa54.jpg

এবার তোমরা বলতে পারবে অ্যামোনিয়াম ক্লোরাইড ($ NH_{4}Cl $) ও পটাশিয়াম ক্লোরেটের ($ KClO_{3} $) বিয়োজন বিক্রিয়ার ফলে কী কী উৎপন্ন হবে ?
অ্যামোনিয়াম ক্লোরাইডকে তাপ দিলে তা ভেঙ্গে অ্যামোনিয়া ($ NH _{3} $) গ্যাস ও হাইড্রোজেন ক্লোরাইড (HCl)) গ্যাস উৎপন্ন করে।

Aa55.jpg

পক্ষান্তরে পটাশিয়াম ক্লোরেটকে তাপ দিলে এটি বিয়োজিত হয়ে পটাশিয়াম ক্লোরাইড (KCl) ও অক্সিজেন গ্যাস উৎপন্ন করে।

Aa56.jpg

এই বিক্রিয়ার মাধ্যমে উৎপন্ন অক্সিজেন বিভিন্ন কাজে (যেমন- ডুবুরিরা) ব্যবহার করা হয়।
পাঠ ৮-১১ : রাসায়নিক বিক্রিয়ায় তাপশক্তির রূপান্তর
নিজেরা কর : তোমরা মোম জ্বালালে কি ধরনের রাসায়নিক বিক্রিয়া হয় তা জেনেছ। এবার বল তো এখানে কোনো ধরনের শক্তির রূপান্তর ঘটছে কি? জ্বলন্ত মোমের কাছাকাছি হাত নিলে হাতে গরম লাগে। আবার অন্ধকারে মোম জ্বালালে আমরা এর আশেপাশে দেখতে পাই। তাহলে একথা বলা যায় যে, মোম জ্বালানোর ফলে তাপশক্তি উৎপন্ন হয় বলেই হাতে গরম লাগে আর আলোক শক্তি উৎপন্ন হয় বলেই অন্ধকারে মোম জ্বালালে আমরা এর আশেপাশের জিনিস দেখতে পাই। মোম একটি রাসায়নিক বস্তু। একে পোড়ালে এতে সঞ্চিত রাসায়নিক শক্তি পরিবর্তিত হয়ে তাপশক্তি ও আলোক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। একইভাবে গ্যাসের চুলায় গ্যাস জ্বালালেও গ্যাসে সঞ্চিত রাসায়নিক শক্তি পরিবর্তিত হয়ে প্রচুর তাপশক্তি ও আলোক শক্তি উৎপন্ন করে। উৎপন্ন তাপশক্তি দিয়েই আমরা রান্নাবান্নার কাজ করি।
তাহলে আমরা দেখলাম যে, রাসায়নিক বিক্রিয়ায় শক্তির রূপান্তর ঘটে।
কাজ : খাবার সোডা ও লেবুর রসের বিক্রিয়া।
প্রয়োজনীয় উপকরণ : খাবার সোডা ($ NaHCO_{3} $) বা বেকিং সোডা, টেষ্টটিউব, লেবুর রস, ড্রপার।
পদ্ধতি : টেষ্টটিউবে কিছু খাবার সোডা নাও। ড্রপার দিয়ে আস্তে আস্তে লেবুর রস টেষ্টটিউবে যোগ কর। কী দেখতে পাচ্ছ? গ্যাসের বুদবুদ উঠছে? হ্যাঁ, প্রচুর গ্যাসের বুদবুদ উঠেছে। টেষ্টটিউবের তলায় স্পর্শ করে দেখ হাতে গরম লাগে কি?
লেবুর রসে থাকে প্রচুর সাইট্রিক এসিড যা বেকিং সোডার সাথে বিক্রিয়া করে সোডিয়াম সাইট্রেট, কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাস ও পানি তৈরি করে। আমরা যে বুদবুদ দেখি তা $ CO_{2} $ ছাড়া আর কিছুই নয়।

Aa57.jpg

টেষ্টটিউবে ¯পর্শ করে গরম লাগার কারণ কী ? কারণ হলো এই বিক্রিয়ায় তাপশক্তি উৎপন্ন হয়। তা না হলে গরম লাগত না।
এখন তোমরা বেকিং সোডার সাথে লেবুর রসের বদলে ভিনেগার বা এসিটিক এসিড যোগ করে দেখ কী ঘটে?
কাজ : চুন ও ভিনেগারের রাসায়নিক বিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ।
উপকরণ : চুন (CaO), ভিনেগার, বিকার, হাতমোজা, ড্রপার।
পদ্ধতি : হাতমোজা পরে কিছু চুন বিকারে নাও। এবার এতে ড্রপার দিয়ে আস্তে আস্তে ভিনেগার যোগ কর। বিকারটি হাত দিয়ে স্পর্শ করে দেখ। গরম লাগছে? কারণ কী? এখানে চুনের সাথে ভিনেগারের বিক্রিয়ায় ক্যালসিয়াম এসিটেট ও পানি তৈরি হচ্ছে আর প্রচুর তাপশক্তিও উৎপন্ন হচ্ছে। উৎপন্ন তাপের কারণেই বিকারে স্পর্শ করলে গরম লাগছে।

Aa58.jpg

এখানে চুন হলো ক্ষারীয় পদার্থ ও এসিটিকএসিড হলো অম্লধর্মী পদার্থ আর উৎপাদিত ক্যালসিয়াম এসিটেট হলো নিরপেক্ষ পদার্থ। এই জাতীয় বিক্রিয়া যেখানে বিপরীতধর্মী পদার্থ একে অপরের সাথে বিক্রিয়া করে নিরপেক্ষ পদার্থ তৈরি করে তাকে প্রশমন বিক্রিয়া (Neutralization reaction) বলে।
এখন তোমরা চুনে ভিনেগারের বদলে লেবুর রস দিয়ে দেখ কী ধরনের বিক্রিয়া ঘটে?
কাজ : চুনের পানির সাথে ভিনেগারের বিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ
প্রয়োজনীয় উপকরণ : চুন, পানি, ভিনেগার, বিকার, হাতমোজা, স্পেচুলা, ড্রপার।
পদ্ধতি : ৫ গ্রাম পরিমাণ (ভিন্ন পরিমাণও নেওয়া যেতে পারে) চুন বিকারে নাও। ড্রপার দিয়ে ৪০ গ্রাম পানি আস্তে আস্তে যোগ কর। হাতমোজা পরে বিকার স্পর্শ কর। পানি যোগ করার পর কোনো পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছ?
বিকার অনেক বেশি গরম হয়ে যাচ্ছে আর বিকারের মিশ্রণটি অনেকটা পানি ফুটানোর সময় যে রকম টগবগ করে অনেকটা সেরকম করছে। এখানে চুনে পানি যোগ করার ফলে, চুন ও পানির মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে ক্যালসিয়াম হাইড্রোক্সাইড উৎপন্ন হয়।

Aa59.jpg

উৎপন্ন $ Ca(OH)-{2} $ কুইক লাইম নামেই বেশি পরিচিত। এই বিক্রিয়ায় প্রচুর পরিমাণে তাপশক্তি উৎপন্ন হয় যার ফলে পানি ফুটতে থাকে। কুইক লাইম বা $ Ca(OH)-{2} $ পানিতে খুব অল্প পরিমাণে দ্রবীভূত হয়। আর পানিতে$ Ca(OH)-{2} $ এর সম্পৃক্ত দ্রবণকেই চুনের পানি বা লাইম ওয়াটার বলা হয়।
উপরের পরীক্ষাতে তোমরা যে সাসপেসনটি পেলে তা কিছুক্ষণ রেখে দাও। উপরে পরিষ্কার পানির মতো যে অংশটি দেখা যাচ্ছে সেটিই কিন্তু চুনের পানি। চুনের পানিকে ফিল্টার দিয়ে আলাদা করে নাও। এবার ড্রপার দিয়ে আস্তে আস্তে ভিনেগার যোগ কর। দেখ তো বিকার গরম হচ্ছে কি না? এখানে কী ধরনের বিক্রিয়া হচ্ছে?
পাঠ ১২-১৪ : শুষ্ক কোষ
আমরা টর্চ লাইট, বিভিন্ন রকম রিমোট কন্ট্রোলার, নানা রকম খেলনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে যে ব্যাটারি ব্যবহার করি এগুলোকে ড্রাইসেল বা শুষ্ক কোষ বলে।
তোমরা কি জান এই শুষ্ক কোষ কীভাবে তৈরি করা হয় ?

Aa60.jpg

প্রথমে অ্যামোনিয়াম ক্লোরাইড $ (NH_{4}Cl) $, কয়লার গুঁড়া এবং ম্যাংগানিজ ডাইঅক্সাইড $ MnO_{2} $ ভালোভাবে মিশিয়ে তাতে অল্প পরিমাণ পানি যোগ করে একটি পেষ্ট বা লেই তৈরি করা হয়। এই মিশ্রণটি সিলিন্ডার আকৃতির দস্তার চোঙে নিয়ে তার মধ্যে একটি কার্বন দণ্ড বসানো হয় এমনভাবে যাতে দণ্ডটি দস্তার চোঙকে স্পর্শ না করে। কার্বন দণ্ডের মাথায় একটি ধাতব টুপি পরানো থাকে। শুষ্ক কোষের উপরের অংশ কার্বন দণ্ডটির চারপাশ পিচের আস্তরণ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। দস্তার চোঙটিকে একটি শক্ত কাগজ দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়। এখানে দস্তার চোঙ ঋণাত্মক তড়িৎদ্বার বা অ্যানোড হিসেবে কাজ করে আর ধাতব টুপি দিয়ে ঢাকা কার্বন দণ্ডের উপরিভাগ ধনাত্মক তড়িৎদ্বার বা ক্যাথোড হিসেবে কাজ করে। এখন আমরা দেখে নিই কীভাবে শুষ্ক কোষ কাজ করে।
কাজ : শুষ্ক কোষ দিয়ে তড়িৎ বর্তনী তৈরি করে শক্তির রূপান্তর দেখা।
প্রয়োজনীয় উপকরণ : ১টি বৈদ্যুতিক বাল্ব, ১টি শুষ্ক কোষ, তামার তার ২টি।
পদ্ধতি : ১টি তামার তারের এক প্রান্ত শুষ্ক কোষের অ্যানোড ও অপর তামার তারটি ক্যাথোডের সাথে যুক্ত কর। এবার চিত্রের মতো করে বৈদ্যুতিক বাল্বের সাথে তার দুটি সংযোগ দাও। বাল্বটি জ্বলে উঠল। কারণ হলো এখানে তামার তারের মাধ্যমে বাল্ব ও ব্যাটারির মধ্যে একটি বৈদ্যুতিক সার্কিট তৈরি হয়ে গেল।

Aa61.jpg

এখানে কী ধরনের শক্তির রূপান্তর ঘটল? বর্তনী তৈরি হওয়ার ফলে বাল্ব জ্বলছে এবং তা আলোক শক্তি দিচ্ছে। এই আলোক শক্তি আসছে ব্যাটারি থেকে। আর ব্যাটারির শক্তির উৎস হলো এখানে ব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থ অর্থাৎ দস্তা, অ্যামোনিয়াম ক্লোরাইড, কয়লার গুঁড়া ও $ MnO_{2} $। তাহলে বলা যায় যে, ঐ সকল রাসায়নিক পদার্থের সঞ্চিত শক্তিই রূপান্তরিত হয়ে
তড়িৎ বিশ্লেষণ (Electrolysis)
কাজ : তড়িৎ বিশেষণ সম্পর্কে জানা।
প্রয়োজনীয় উপকরণ : ১টি ব্যাটারি, তামার তার (দুটি), দুটি কার্বন দণ্ড, পানি, লবণ, একটি বিকার।

Aa62.jpg

পদ্ধতি : বিকারে ৩০০ মিলিলিটার পরিমাণ পানি নিয়ে ৩০ গ্রাম সোডিয়াম ক্লোরাইড (NaCl) বা লবণ যোগ করে ভালোভাবে নাড়া দাও। এবার কার্বন দণ্ড দুটি চিত্র অনুযায়ী তামার তার দিয়ে ব্যাটারির সাথে সংযুক্ত কর। কার্বন দণ্ডের দিকে ভালো করে লক্ষ কর। ১টি কার্বন দন্ডের গায়ে গ্যাসের বুদবুদ দেখতে পাচ্ছ কি ? অন্যটির কোনো পরিবর্তন লক্ষ করছ কি?
হ্যাঁ, যে কার্বন দণ্ডটি ব্যাটারির ধনাত্মক মেরুর সাথে সংযুক্ত, সেটিতে গ্যাসের বুদবুদ জমে যাচ্ছে আর যে দণ্ডটি ব্যাটারির ঋণাত্মক মেরুর সাথে সংযুক্ত আছে সেটিতে ধূসর একটি প্রলেপের মতো দেখা যাচ্ছে। কেন এমনটি হচ্ছে? এর কারণ হলো ব্যাটারির সাথে সংযোগ দিয়ে দ্রবীভূত লবণের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহের ফলে ক্লোরাইড আয়ন (Cl-) অ্যানোডে গিয়ে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে ক্লোরিন গ্যাস $ Cl_{2} $ উৎপন্ন করে। তাই আমরা অ্যানোডে গ্যাসের বুদবুদ দেখতে পাই। অন্যাদিকে সোডিয়াম আয়ন (Na+) বিদ্যুৎ প্রবাহের ফলে ক্যাথোডে গিয়ে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে ধাতব সোডিয়াম (Na) উৎপন্ন করে যার ফলে ক্যাথোডে ধূসর প্রলেপ দেখা যাচ্ছে।

Aa63.jpg

তড়িৎ প্রবাহের ফলে লবণের এই রাসায়নিক পরিবর্তন যা ক্লোরিন গ্যাস ও ধাতব সোডিয়াম উৎপন্ন করেছে, তাকে তড়িৎ বিশেষণ বলে।
লবণের মতো যে সকল পদার্থ তড়িৎ প্রবাহের ফলে রাসায়নিক বিক্রিয়া করে অন্য পদার্থে পরিণত হয় তাদেরকে তড়িৎ বিশেষ্য (Electrolyte) বলে।
সব পদার্থ তড়িৎ প্রবাহের ফলে রাসায়নিক বিক্রিয়া করে না। যে সমস্ত পদার্থ দ্রবীভূত বা বিগলিত অবস্থায় তড়িৎ পরিবহন করে না ফলে রাসায়নিক বিক্রিয়াও করে না, তাদেরকে তড়িৎ অবিশেষ্য পদার্থ বলে। যেমন- চিনি, গ্লুকোজ ইত্যাদি।

এই অধ্যায় পাঠ শেষে যা শিখলাম-
- সংযোজন বিক্রিয়ায় একের অধিক পদার্থ একত্রিত হয়ে একটি নতুন পদার্থ তৈরি করে।
- দহন বিক্রিয়ায় একটি পদার্থ বাতাসের অক্সিজেনের সাহায্যে পুড়ে প্রচুর তাপশক্তি ও আলোক শক্তি উৎপন্ন করে।
- প্রতিস্থাপন বিক্রিয়ায় একটি মৌল কোনো যৌগ থেকে অপর একটি মৌলকে প্রতিস্থাপিত করে নতুন পদার্থ তৈরি করে।
- যে বিক্রিয়ায় একটি যৌগ ভেঙে একের অধিক নতুন পদার্থে পরিণত হয় তাকে বিয়োজন বিক্রিয়া বলে।
- রাসায়নিক বিক্রিয়ায় শক্তির রূপান্তর ঘটে।
- প্রশমন বিক্রিয়ায় বিপরীত ধর্মী পদার্থ বিক্রিয়া করে একে অপরকে নিষ্ক্রিয় করে নিরপেক্ষ পদার্থ উৎপন্ন করে। দহন বিক্রিয়ায় সাধারণত রাসায়নিক শক্তি তাপ ও আলোক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।
- শুষ্ক কোষ ব্যবহার করলে রাসায়নিক শক্তি রূপান্তরিত হয়ে আলোক শক্তি বা অন্য কোনো শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।
- যে সমস্ত পদার্থ দ্রবীভূত বা গলিত অবস্থায় বিদ্যুৎ পরিবহন করে তাদেরকে তড়িৎ বিশেষ্য পদার্থ বলে।
- যে সমস্ত পদার্থ দ্রবীভূত বা গলিত অবস্থায় বিদ্যুৎ পরিবহন করে না তাদেরকে তড়িৎ অবিশেষ্য পদার্থ বলে।


Share your opinion